
বিনামূল্যে নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানিকে দেশের প্রত্যেক নাগরিকের জন্য মৌলিক অধিকার হিসেবে ঘোষণা করে যুগান্তকারী রায় দিয়েছেন মহামান্য হাইকোর্ট। রায়ে আগামী এক বছরের মধ্যে জনসমক্ষে এবং ১০ বছরের মধ্যে দেশের সব নাগরিকের জন্য বিনামূল্যে নিরাপদ পানি নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যা বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য অন্যতম এক পাওয়া হিসেবে দেখছেন অনেকে।
বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল ও বিচারপতি কাজী ওয়ালিউল ইসলাম সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের দেওয়া জনস্বার্থমূলক এই রায়ের ১৬ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে মামলাটি চলমান রাখা হয়েছে। উল্লেখ্য, গত বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি এ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত রায় দিয়েছিলেন আদালত।
এ রায়ে আদালত নির্দেশ দেন, দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক প্লেসে বিনামূল্যে পানি সরবরাহে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে সরকারকে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন আগামী ২৭ ফেব্রুয়ারি আদালতে দাখিল করতে হবে।
প্রসঙ্গত, এই মামলার সূত্রপাত হয় ২০২০ সালে, যখন দেশের প্রত্যেক নাগরিকের জন্য নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করার বিষয়ে জনস্বার্থে স্বপ্রণোদিত হয়ে (সুয়োমোটো) রুল জারি করেন হাইকোর্ট। ওই রুলে প্রশ্ন তোলা হয়, নিরাপদ পানি সরবরাহ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব কি না এবং এটি নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হিসেবে ঘোষণাযোগ্য কি না। চূড়ান্ত শুনানি শেষে আদালত এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন।
রায়ে মহামান্য হাইকোর্ট বলেন, সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপদ পানি পাওয়ার অধিকার একটি মৌলিক অধিকার এবং তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এই অধিকার বাস্তবায়নে আদালত সরকারকে একাধিক নির্দেশনা দেন। এর মধ্যে রয়েছে, দেশের পানির উৎসগুলো যাতে শুকিয়ে না যায়, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, পানির উৎস দূষণমুক্ত রাখা এবং অনিরাপদ পানি ব্যবহার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।
আদালত আরও নির্দেশ দেন, প্রাথমিকভাবে আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক স্থানে, যেমন আদালত, ধর্মীয় উপাসনালয়, রেলস্টেশন, বাস ও লঞ্চ টার্মিনাল, বিমানবন্দর, হাট-বাজার, শপিংমল, সরকারি হাসপাতাল, সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, লবণাক্ত উপকূলীয় এলাকা ও প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চলে নিরাপদ পানিপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে।
মামলার শুনানিতে এমিকাস কিউরি হিসেবে মতামত দেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। এ ছাড়া বেলার পক্ষে আইনজীবী মিনহাজুল হক চৌধুরী এবং ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব শুনানিতে অংশ নেন।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব বলেন, এটি নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী রায়। পানি মানেই জীবন—পানি ছাড়া জীবন নেই। এই রায়ের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনে নিরাপদ পানির গুরুত্ব স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, নিরাপদ পানি না পেলে এখন থেকে যে কোনো নাগরিক আদালতের শরণাপন্ন হতে পারবেন।