

প্রতিবছরই আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতা থেকে পুরস্কার নিয়ে আসে আমাদের শিক্ষার্থীরা। গৌরব অর্জন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গণে। নতুন বছর শুরু মানেই আবার নতুন চ্যালেঞ্জ, নতুন সম্ভাবনা, আর প্রস্তুতির জন্য সবচেয়ে ভালো সময়ও এখনই। সামনে কী কী বড় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা আছে? কোন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থান কেমন? আর কোথা থেকে পাওয়া যাবে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও দিকনির্দেশনা? এমন প্রশ্নের উত্তর চায় অনেকে, খুজতে থাকে কোথায় কেমন সুযোগ বা অন্যান্য কিছু আছে। এ ধরনের বিষয়কে সহায়তা করবে এ লেখাটি।
এ তালিকায় আছে উদ্যোক্তা থেকে মহাকাশ-প্রযুক্তি, গবেষণা থেকে প্রোগ্রামিং, রোবোটিকস থেকে বিতর্ক- এমন নানা ক্ষেত্রের শীর্ষ আন্তর্জাতিক আসর। প্রতিটি প্রতিযোগিতার ধরন আলাদা, প্রস্তুতির পদ্ধতিও ভিন্ন। তবে একটি জায়গায় সবাই এক, সময়মতো প্রস্তুতি নিলে সুযোগ তৈরি হয় আর সেই সুযোগই একদিন বিশ্বমঞ্চে দেশের প্রতিনিধিত্বে রূপ নেয়। এনে দেয় নয়া সম্ভাবনা ও অর্জন। আজ দেখব সেই সম্ভাবনার জায়গাগুলো।
বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার ‘ব্যবসায়িক সমাধান’ খোঁজার এই প্রতিযোগিতাকে বলা হয় ‘ছাত্রদের নোবেল পুরস্কার’। শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে যেসব আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা হয়, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় পুরস্কারগুলোর একটি হাল্ট প্রাইজ। প্রতিবছরই আমাদের শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নিচ্ছে।
দেশে বর্তমানে ১০০’এর বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে হাল্ট প্রাইজের অন-ক্যাম্পাস রাউন্ড অনুষ্ঠিত হয়। এখান থেকেই নির্বাচিত হয়ে ধাপে ধাপে এগোতে হয়। সাধারণত তিন-চারজনের দল গঠন করে অংশ নিতে হয়।
১৮৮৩ সালে শুরু হওয়া এই প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর তরুণদের কণ্ঠস্বর বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা হয়। সাহিত্য ও সৃষ্টিশীল লেখার মর্যাদাপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচিত এটি। প্রতিবছর বাংলাদেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অংশ নেয় এবং নিয়মিত গোল্ড ও সিলভার মেডেলও আসে।
ফিলিপ সি. জেসাপ ইন্টারন্যাশনাল ল মুট কোর্ট কম্পিটিশন বিশ্বের বৃহত্তম ও সবচেয়ে পুরোনো মুট কোর্ট প্রতিযোগিত- আইন শিক্ষার্থীদের ‘বিশ্বকাপ’ নামে পরিচিত। কাল্পনিক আন্তর্জাতিক আদালতে একটি দেশের হয়ে যুক্তি উপস্থাপন করতে হয়। ১৯৬০ সালে শুরু হওয়া এই প্রতিযোগিতায় ২০১৭ সাল থেকে অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিবছরই মূল আসরে যাওয়ার লক্ষ্যে প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়।
সুযোগ-সুবিধা
বিশ্বের সবচেয়ে বড় হ্যাকাথনগুলোর একটি নাসা স্পেস অ্যাপস চ্যালেঞ্জ। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার দেওয়া উপাত্ত ব্যবহার করে পৃথিবী ও মহাকাশের বিভিন্ন জটিল সমস্যার সমাধান করতে হয় এখানে। বাংলাদেশের দলগুলো এই প্রতিযোগিতায় ধারাবাহিকভাবে ভালো করছে।
সুযোগ-সুবিধা
শেষ বর্ষে থিসিস বা গবেষণাপত্র তৈরি করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছ? অনুপ্রেরণা হতে পারে এই প্রতিযোগিতা। স্নাতক পর্যায়ের গবেষণাকেই পুরস্কৃত করে ‘গ্লোবাল আন্ডারগ্র্যাজুয়েট অ্যাওয়ার্ডস’। বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিয়মিতই এতে ‘আঞ্চলিক বিজয়ী’ হয়ে আয়ারল্যান্ডে দেশের প্রতিনিধিত্ব করে। ২৫টি ভিন্ন ক্যাটাগরিতে বিশ্বসেরাদের সঙ্গে এখানে মেধার লড়াই হয়।
তবে সঠিক তথ্য ও নির্দেশনার অভাবে এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সাফল্যের হার তুলনামূলক কম-এমন পর্যবেক্ষণও রয়েছে।
সুযোগ-সুবিধা
স্টার্টআপ ওয়ার্ল্ড কাপ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পেগাসাস টেক ভেঞ্চার্সের উদ্যোগে ১০০টির বেশি দেশে অনুষ্ঠিত হয়। উদ্ভাবনী স্টার্টআপকে বিনিয়োগকারী, করপোরেট ব্যক্তিত্ব ও প্রযুক্তি খাতের গুরুত্বপূর্ণ মানুষের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ দেয় এটি। বাংলাদেশে আয়োজন করে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইনোভেশন অ্যান্ড এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ বিভাগ। গত বছর বাংলাদেশ পর্বে বিজয়ী হয়ে ৫০ হাজার টাকার বিনিয়োগ জিতে নেয় ‘রোবোলাইফ’।
সুযোগ-সুবিধা
আন্তর্জাতিক কলেজিয়েট প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা (আইসিপিসি)-কে বলা হয় প্রোগ্রামিংয়ের বিশ্বকাপ। এটি কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা প্রতিবছর শুধু যে এতে অংশ নিচ্ছে তা নয়, ২০২২ সালে বাংলাদেশ ছিল চূড়ান্ত আসরের (ওয়ার্ল্ড ফাইনালস) আয়োজকও।
ডেটা স্ট্রাকচার ও অ্যালগরিদমে দক্ষ শিক্ষার্থীদের জন্য এটি বড় “ব্যাটলগ্রাউন্ড”। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নিয়মিত ভালো ফল করে আসছে।
সুযোগ-সুবিধা
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের কাছে ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জ (ইউআরসি) বেশ জনপ্রিয়। সারা বিশ্বেও এটি অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ রোবোটিকস প্রতিযোগিতা। মঙ্গলগ্রহের উপযোগী রোভার (রোবট) তৈরি করতে হয় এখানে।
ঢাকার ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ইউআইইউ), ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, এমআইএসটি, গাজীপুরের আইইউটি এমন বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়মিত অংশ নিচ্ছে। গত বছর ইউআইইউ মার্স রোভার টিম এশিয়ায় প্রথম এবং বিশ্বব্যাপী ষষ্ঠ স্থান অর্জন করে। শিক্ষার্থীদের বিশ্বাস- যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আরও সুখবর আসতে পারে।
সুযোগ-সুবিধা
১৯৮০ সালে টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হওয়া ফর্মুলা এসএই বর্তমানে অটোমোটিভ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বড় আসর। এখানে শিক্ষার্থীদের ছোট আকারের ‘ফর্মুলা স্টাইল’ রেসিং কার নকশা ও নির্মাণ করতে হয়। ‘ফর্মুলা এসএই জাপান ২০২৫’ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) দল ‘টিম ক্র্যাক প্লাটুন’ সার্বিক র্যাঙ্কিংয়ে ১৮তম স্থান অর্জন করে। ‘পিআর অ্যাওয়ার্ড’ বিভাগে তাদের অবস্থান ছিল তৃতীয়।
সুযোগ-সুবিধা
বিতর্কের বিশ্বকাপ হিসেবে পরিচিত এই প্রতিযোগিতায় বিশ্বের শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতার্কিকেরা অংশ নেয়। এর আগে এ প্রতিযোগিতায় পূর্ব সাফল্য বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য এটি বড় অনুপ্রেরণা, আগামী আসরে যারা অংশ নিতে চায়, তাদের এখন থেকেই প্রস্তুতি জরুরি।
সুযোগ-সুবিধা
আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে সবচেয়ে জরুরি তিনটি জিনিস, সঠিক তথ্য, নিয়মিত অনুশীলন এবং দল/মেন্টর নেটওয়ার্ক। তুমি যদি শিক্ষার্থী হও, তাহলে তোমার ক্যাম্পাসের সংশ্লিষ্ট ক্লাব/কমিউনিটি, টিম বা সিনিয়র অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে যুক্ত হওয়াই দ্রুততম পথ। কারণ, তাদের অভিজ্ঞতা থেকেই পাওয়া যায় প্রকৃত দিকনির্দেশনা, কীভাবে দল গঠন করবে, কীভাবে প্রপোজাল/পেপার/ডেমো/প্রেজেন্টেশন দাঁড় করাবে আর কীভাবে সময়মতো প্রস্তুতি নেবে।
বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের যে সাফল্য ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে, সেটিই বলে দেয়, প্রস্তুতি ঠিক থাকলে নতুন বছর মানেই নতুন পদক, নতুন গল্প, নতুন অর্জন।