

এইচএসসি পরীক্ষার্থী সুমনার কাছে পরীক্ষার প্রস্তুতি মানেই শুধু বই পড়া নয়, বরং একজন উপযুক্ত শ্রুতি লেখক খুঁজে পাওয়ার দীর্ঘ ও অনিশ্চিত সংগ্রাম। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী হওয়ায় পরীক্ষার খাতায় নিজের উত্তর নিজে লিখতে পারেন না তিনি। তাই তার প্রতিটি পরীক্ষার আগে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়ায় একজন শ্রুতি লেখক নিশ্চিত করা।
অন্যান্য শিক্ষার্থীরা যখন পরীক্ষার প্রস্তুতি, সাজেশন এবং ভালো ফলাফলের চিন্তায় ব্যস্ত থাকে, তখন সুমনাকে পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন স্কুলে যেতে হয়, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলতে হয় এবং বারবার বোঝাতে হয় কেন একজন শ্রুতি লেখক তার জন্য অপরিহার্য।
প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী একজন এইচএসসি পরীক্ষার্থীর জন্য সাধারণত দশম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থীকে শ্রুতি লেখক হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু উপযুক্ত শিক্ষার্থী খুঁজে পাওয়া, তাকে রাজি করানো এবং তার অভিভাবকদের সম্মতি নেওয়া সবসময় সহজ হয় না। অনেক সময় পরীক্ষার এক সপ্তাহ আগে কিংবা কয়েক দিন আগে পর্যন্তও শ্রুতি লেখক নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না।
সুমনা বলেন, “পরীক্ষার পড়াশোনার চেয়ে অনেক সময় শ্রুতি লেখক খুঁজে পাওয়ার চিন্তাই বেশি কষ্ট দেয়। একজন লেখক না পেলে আমি পরীক্ষায় অংশগ্রহণই করতে পারব না- এই ভয় সবসময় কাজ করে।”
শ্রুতি লেখক খুঁজে পাওয়ার পরও শেষ হয় না ভোগান্তি। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ, বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং শিক্ষা বোর্ডের অনুমোদন নেওয়ার মতো দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাকে। এসব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করার পরেই পরীক্ষার হলে বসার সুযোগ পান একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালে পাবলিক ও শ্রেণি পরীক্ষার জন্য একটি অভিন্ন শ্রুতি লেখক নীতিমালা জারি করেছে। এর মাধ্যমে সারা দেশে একই নিয়মে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন পরীক্ষার্থীদের জন্য শ্রুতি লেখক সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নীতিমালা অনুযায়ী সরকারি ও বেসরকারি স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই সুবিধা পাবেন। একই সঙ্গে সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড এবং মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীন পরীক্ষাগুলোতেও এই ব্যবস্থা কার্যকর হবে।
এতে শ্রুতি লেখকের যোগ্যতা, আবেদন পদ্ধতি ও দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি পরীক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত সময়ের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। প্রতি এক ঘণ্টার পরীক্ষার জন্য অতিরিক্ত ১৫ মিনিট সময় দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে, যাতে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা সমান সুযোগ নিয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারেন।
এ বিষয়ে আজিজুন্নাহার তমা (প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর, লাল সবুজ সোসাইটি) বলেন, “দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য শ্রুতি লেখক কোনো বিশেষ সুবিধা নয়, এটি তাদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। নতুন নীতিমালা ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সমাজের মানুষকেও এগিয়ে আসতে হবে, যাতে কোনো শিক্ষার্থী শুধুমাত্র একজন শ্রুতি লেখকের অভাবে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়।”
তিনি আরও বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সচেতন নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে একটি সহজ ও শিক্ষার্থী-বান্ধব শ্রুতি লেখক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানো শুধু সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয় নয়, এটি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনেরও পূর্বশর্ত। একজন শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, মেধা ও সম্ভাবনা যেন কেবল একজন শ্রুতি লেখকের অভাবে থেমে না যায়, সে জন্য সমাজের সর্ব স্তরের মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন।
কারণ শিক্ষা কোনো করুণা নয়, এটি প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার।