

সংসারের অভাব অনটন যখন চারদিক থেকে ঘিরে ধরেছিল, তখন লোকলজ্জা আর সামাজিক অপবাদকে তুড়ি মেরে জীবনযুদ্ধে নেমেছিলেন আরজু বেগম। দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার প্রথম নারী হকার হিসেবে আজ থেকে ৯ বছর আগে সংবাদপত্র বিক্রির পেশা শুরু করেন তিনি। বর্তমানে তিনি শুধু একজন স্বাবলম্বী নারীই নন বরং সমাজের জন্য এক অনুপ্রেরণার নাম হয়ে উঠেছেন।
ফুলবাড়ী উপজেলার চক শাহাবাজপুর গ্রামের বাসিন্দা ৪২ বছর বয়সী আরজু বেগমের জীবনপথ ছিল চরম সংগ্রামের। তাঁর স্বামী আশরাফুল আলম বাবু সাত বছর নিরুদ্দেশ থাকায় দুই মেয়েকে নিয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। একাই টেনেছেন সংসারের ঘানি। একসময় দর্জির কাজ করলেও তাতে দুই মেয়ের পড়াশোনা ও সংসারের খরচ চালানো সম্ভব হচ্ছিল না। এমন সংকটময় সময়ে ৯ বছর আগে পত্রিকা এজেন্ট মোন্নাফ আলীর পরামর্শে সংবাদপত্র বিক্রির চ্যালেঞ্জিং পেশা বেছে নেন তিনি।
শুরুর দিনগুলো সহজ ছিল না। একজন নারী হয়ে সাইকেল চালিয়ে বাড়ি বাড়ি পত্রিকা বিলি করাকে সমাজ ভালো চোখে দেখেনি। নানা অপবাদ আর গ্লানি সহ্য করতে হয়েছে তাঁকে। তবে এসব বাধা তাঁকে দমাতে পারেনি। প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে প্রথমে গরু ও ছাগলগুলোর যত্ন নেন; গৃহস্থালি কাজ শেষ করে বাইসাইকেলে চেপে গ্রাম থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ফুলবাড়ী শহরে যান। সেখান থেকে এজেন্টের কাছ থেকে পত্রিকা সংগ্রহ করে শহর ও গ্রামের ৯টি ওয়ার্ডে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রায় ১৪০ থেকে ১৫০টি পত্রিকা পাঠকদের হাতে পৌঁছে দেন। টানা কয়েক ঘণ্টা পরিশ্রমের পর দুপুরের মধ্যে পত্রিকা বিলি শেষ করে বাসায় ফিরে আসেন তিনি।
প্রযুক্তির চাপে যখন অনেক পুরুষ হকার এই পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন, তখন আরজু বেগম এই পেশা দিয়েই নিজের ভাগ্য বদলেছেন। পত্রিকা বিক্রির আয়ে তিনি দুই মেয়েকে বড় করেছেন এবং অনার্সে পড়িয়েছেন। সম্মানজনকভাবে দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। গড়ে তুলেছেন নিজের পাকা বাড়ি। বর্তমানে তাঁর রয়েছে তিনটি গরু ও দুটি ছাগল। মাসে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা আয় করে বেশ সচ্ছল জীবন কাটাচ্ছেন তিনি।
আরজু বেগমের এই অদম্য স্পৃহা দেখে প্রতিবেশীরা বলেন, ‘আগে ওর অবস্থা খুব খারাপ ছিল। এখন ও নিজের চেষ্টায় সচ্ছল।’ পত্রিকা এজেন্ট মোন্নাফ আলী একটি গনমাধ্যমকে জানান, আরজু বেগমের দায়িত্ববোধ আর সময়ানুবর্তিতা প্রশংসনীয়। নারী হওয়ার কারণে পাঠকরাও সানন্দে নিয়মিত বিল পরিশোধ করে দেন।
উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা রীতা মণ্ডল প্রতিবেদককে বলেন, ‘একজন নারী সব পেশাতেই পারদর্শী হতে পারেন। আরজু বেগমের এই উদ্যোগ সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’ অন্যদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আহমেদ হাছান তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ‘কাজ মানুষকে সম্মানিত করে। আরজু বেগম আমাদের সমাজের জন্য একটি অনন্য দৃষ্টান্ত।’