

রাত গভীর। হঠাৎ কেঁপে ওঠে মেঝে, দুলে ওঠে ফ্যান-আলমারি। কয়েক সেকেন্ডের আতঙ্কে প্রশ্ন জাগে-ভূমিকম্প কেন হয়? পৃথিবীর ভেতরে এমন কী ঘটে যে শক্ত মাটি হঠাৎ থরথর করে কাঁপতে থাকে?
পৃথিবীর ভেতরের অস্থিরতা
পৃথিবী বাইরে থেকে কঠিন মনে হলেও ভেতরে তা স্থির নয়। ভূত্বক (crust) ও উপরের ম্যান্টল মিলিয়ে তৈরি হয়েছে বিশাল কয়েকটি টেকটোনিক প্লেট। এই প্লেটগুলো ক্রমাগত নড়াচড়া করছে-কখনও একে অপরের দিকে ধাক্কা দিচ্ছে, কখনও দূরে সরে যাচ্ছে, আবার কখনও পাশাপাশি ঘষা খাচ্ছে।
যখন দুটি প্লেটের সংযোগস্থলে (ফল্ট লাইনে) প্রচণ্ড চাপ জমে যায় এবং হঠাৎ সেই চাপ মুক্তি পায়, তখনই সৃষ্টি হয় ভূমিকম্প। এই মুক্ত শক্তি তরঙ্গের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, আর আমরা তা অনুভব করি কাঁপুনি হিসেবে।
ফল্ট লাইন: কম্পনের জন্মস্থান
ভূমিকম্প সাধারণত ফল্ট লাইনের আশপাশেই বেশি ঘটে। ফল্ট হলো ভূত্বকের ফাটল বা দুর্বল অঞ্চল। সেখানে প্লেটগুলো আটকে থাকে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে চাপ বাড়তেই থাকে। একসময় সেই আটকে থাকা অংশ সরে গেলে প্রচণ্ড শক্তি নির্গত হয়—এটাই ভূমিকম্প।
ভূমিকম্পের কেন্দ্র কোথায়?
ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলকে বলা হয় হাইপোসেন্টার বা ফোকাস। এর ঠিক ওপরের ভূপৃষ্ঠের স্থানটি হলো এপিসেন্টার। সাধারণত এপিসেন্টারের আশপাশে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়।
কেন কিছু ভূমিকম্প বেশি শক্তিশালী?
ভূমিকম্পের মাত্রা নির্ভর করে-
কত বড় এলাকায় ফল্ট সরে গেছে
কত গভীরে কম্পন সৃষ্টি হয়েছে
কতটা শক্তি জমা হয়েছিল
রিখটার স্কেল বা মোমেন্ট ম্যাগনিচিউড স্কেলে এর তীব্রতা মাপা হয়। মাত্রা যত বাড়ে, শক্তি তত বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।
বাংলাদেশ কতটা ঝুঁকিতে?
বাংলাদেশ তিনটি প্রধান টেকটোনিক প্লেটের সংযোগের কাছাকাছি অবস্থান করছে-ইন্ডিয়ান, ইউরেশিয়ান ও বার্মা প্লেট। ফলে দেশটি ভূমিকম্প-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। বিশেষ করে সিলেট, চট্টগ্রাম ও ঢাকা অঞ্চলে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
শুধু প্লেট নড়াচড়া নয়
ভূমিকম্পের আরও কিছু কারণ আছে-
আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত
ভূগর্ভস্থ গ্যাস বা খনিজ উত্তোলন
বড় বাঁধ বা জলাধারের চাপ
পারমাণবিক বিস্ফোরণ
তবে অধিকাংশ বড় ভূমিকম্পই টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ার ফল।
আমরা কী করতে পারি?
ভূমিকম্প ঠেকানো সম্ভব নয়, কিন্তু প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব।
ভূমিকম্প সহনশীল ভবন নির্মাণ
নিয়মিত মহড়া
ভারী আসবাব দেয়ালে আটকে রাখা
জরুরি যোগাযোগ পরিকল্পনা তৈরি
প্রকৃতি তার নিয়মে চলবে। কিন্তু সচেতনতা ও প্রস্তুতিই পারে আতঙ্ককে নিয়ন্ত্রণে রাখতে।
ভূমিকম্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়-পৃথিবী স্থির নয়, বরং জীবন্ত ও চলমান। সেই চলাচলের ক্ষণিক ঝাঁকুনিই আমাদের কাছে হয়ে ওঠে ভয়ংকর অভিজ্ঞতা।