

নদীভাঙনের বিরুদ্ধে এক নারীর অনন্ত সংগ্রাম-পাঁচবার গৃহহীন শিল্পী বেগম,
তবুও হার মানেননি জীবনযুদ্ধে
মেঘনা নদীর ভাঙনের নির্মমতা যেন পিছু ছাড়ছে না লক্ষ্মীপুরের চরাঞ্চলের মানুষের জীবন থেকে। প্রতিনিয়ত নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি, জমিজমা, স্মৃতি আর স্বপ্ন। এমনই এক নির্মম বাস্তবতার শিকার হয়ে বারবার গৃহহীন হয়েছেন লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার চর রমনী মোহন ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা শিল্পী বেগম। জীবনের কঠিনতম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েও থেমে যাননি তিনি লড়াই করে যাচ্ছেন প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্ত।
স্বামী জাকির হোসেন, চার মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে একসময় ছিল শিল্পী বেগমের ছোট্ট সুখের সংসার। নিজস্ব বসতভিটায় ছিল তাদের স্বপ্নের ঘর, ছিল নিরাপদ জীবনের আশ্রয়। কিন্তু সেই আশ্রয় একবার নয়, পাঁচবার পর্যন্ত গ্রাস করেছে ভয়াল নদীভাঙন। প্রতিবারই গৃহহীন হয়ে নতুন করে শুরু করতে হয়েছে জীবন, নতুন করে গড়তে হয়েছে ভাঙা স্বপ্নের ঘর।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত কয়েক বছরে মেঘনার ভাঙন আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে নদীর তীব্র স্রোত ও ঢেউয়ের আঘাতে মুহূর্তেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে মানুষের বসতভিটা। শিল্পী বেগমও এই ভাঙনের করাল গ্রাস থেকে রেহাই পাননি। একসময় যে জমিতে দাঁড়িয়ে তিনি সংসার গড়েছিলেন, আজ তা শুধুই নদীর বুকে হারিয়ে যাওয়া এক স্মৃতি।
শিল্পী বেগম বলেন, “প্রথমবার যখন ঘর ভাঙে, মনে হয়েছিল আবার ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু একের পর এক পাঁচবার ঘর ভাঙার পর এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। আমরা যেখানে যাই, সেখানেই ভাঙন আমাদের পিছু নেয়। সন্তানদের নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটাই।”
বর্তমানে অন্যের জমিতে অস্থায়ীভাবে আশ্রয় নিয়েছেন তারা। টিন আর পলিথিনে ঘেরা ছোট্ট একটি ঘরেই চলছে তাদের বসবাস। নেই কোনো নিরাপত্তা, নেই স্থায়িত্বের নিশ্চয়তা। প্রতিদিনই দুশ্চিন্তায় কাটে এই আশ্রয়টুকুও যদি কোনোদিন হারিয়ে যায়!
সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বেশি চিন্তিত শিল্পী বেগম। অভাব-অনটনের মাঝেও তিনি চান তার সন্তানরা লেখাপড়া করে মানুষের মতো মানুষ হয়ে উঠুক। কিন্তু বারবার স্থান পরিবর্তন, আর্থিক সংকট এবং অনিশ্চিত জীবনের কারণে সেই স্বপ্নও হুমকির মুখে।
শুধু শিল্পী বেগম নন, চরাঞ্চলের হাজারো পরিবার আজ একই দুর্দশার শিকার। নদীভাঙনে গৃহহীন হয়ে তারা কেউ রাস্তার পাশে, কেউ অন্যের জমিতে, আবার কেউ আশ্রয় নিয়েছেন অস্থায়ী বাঁধের ওপর। প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তা আর ভয় নিয়ে জীবনযাপন করছেন তারা।
ভুক্তভোগীদের দাবি, নদীভাঙন রোধে কার্যকর ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এখন সময়ের দাবি। তারা বলেন, সাময়িক নয়, স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারকে গৃহহীন হতে না হয়।
এ বিষয়ে লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসক এস এম মেহেদী হাসান বলেন, “নদীভাঙন রোধে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে। লক্ষ্মীপুরে প্রায় সাত কিলোমিটার এলাকায় ব্লক দিয়ে টেকসই বাঁধ নির্মাণের একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। আশা করছি খুব দ্রুতই এর কাজ দৃশ্যমান হবে এবং এতে ভাঙন অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আসবে।
তিনি আরও বলেন, “নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় ও দুস্থ পরিবারগুলোর জন্য সরকারের বিশেষ তহবিল রয়েছে। যারা প্রকৃতপক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত, তারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে যথাসাধ্য সহায়তা করার চেষ্টা করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীভাঙন একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া হলেও সঠিক পরিকল্পনা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এর ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে নদী তীরবর্তী মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করা জরুরি।
নদীভাঙন কেবল ঘরবাড়ি বা জমি নয়, মানুষের স্বপ্ন, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎও কেড়ে নেয়। তবুও জীবনযুদ্ধে হার মানেননি শিল্পী বেগম। প্রতিকূলতার মাঝেও নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখেন তিনি। তার মতো অসংখ্য নারী প্রতিদিন সংগ্রাম করে যাচ্ছেন নিজেদের জন্য, তাদের সন্তানের জন্য, একটি নিরাপদ জীবনের আশায়।
শিল্পী বেগমের এই অদম্য সংগ্রাম কেবল ব্যক্তিগত নয়, এটি চরাঞ্চলের হাজারো মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি। তাদের এই লড়াইয়ের শেষ কোথায় সেই উত্তর খুঁজছে পুরো জনপদ।