

সভ্যতার ক্রমবিকাশে মানুষের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা। এটি কেবল জ্ঞান অর্জনের উপায় নয় বরং অন্ধকার থেকে আলোতে যাত্রার পথও। বিশ্বমঞ্চে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই, এই ধ্রুব সত্যটি বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দিতেই প্রতিবছর ২৪ জানুয়ারি পালিত হয় ‘আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস’। ২০১৯ সাল থেকে জাতিসংঘের উদ্যোগে বিশ্বজুড়ে দিবসটি উদযাপিত হয়ে আসছে।
দিবসটি উপলক্ষে আজ শনিবার (২৪ জানুয়ারি) ঢাকার সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে বাংলাদেশ জাতীয় ইউনেস্কো কমিশন।
দিবস পালনের প্রেক্ষাপট ও উদ্দেশ্য
২০১৮ সালের ৩ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের ৭৩/২৫ নম্বর প্রস্তাব অনুযায়ী ২৪ জানুয়ারিকে আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস হিসেবে ঘোষণার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা ও বৈশ্বিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় শিক্ষার ভূমিকা তুলে ধরতেই এই উদ্যোগ নেয় জাতিসংঘ। এতে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-২০৩০ (এসডিজি)’ বিশেষ করে এসডিজি-৪, যেখানে সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
এই দিবস পালনের মূল উদ্দেশ্য হলো শান্তি ও উন্নয়নের স্বার্থে শিক্ষার অপরিহার্য ভূমিকাকে স্বীকৃতি দেওয়া। যদিও জাতিসংঘের মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রে শিক্ষাকে প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
ইউনেস্কোর লক্ষ্য: অন্তর্ভুক্তিমূলক ও আজীবন শিক্ষা
আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস পালনের পেছনে ইউনেস্কোর একটি বড় লক্ষ্য হলো ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা’। অর্থাৎ রাজনৈতিক, ভৌগোলিক বা শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে কেউ যেন শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত না থাকে। দারিদ্র্য, দুর্গম অঞ্চল কিংবা প্রতিবন্ধকতা কোনো কিছুই যেন একজন মানুষকে শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে না পারে, সেটিই তাদের লক্ষ্য।
ইউনেস্কো আরও জোর দিচ্ছে ‘আজীবন শিক্ষা’ বা লাইফ লং লার্নিংয়ের ওপর। তাদের মতে, শিক্ষা মানে কেবল স্কুল-কলেজের পাঠ্যবই নয়। শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু ভালো চাকরি বা ক্যারিয়ার গড়া নয়; বরং সহনশীলতা তৈরি, ঘৃণা দূর করা এবং শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়াই শিক্ষার আসল কাজ। শিক্ষা যেন আমাদের কেবল দক্ষ কর্মী নয়, বরং মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে, এটাই মূল দর্শন।
২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য: শিক্ষায় তারুণ্যের শক্তি
গত বছর আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘এআই ও শিক্ষা: স্বয়ংক্রিয় বিশ্বে মানুষের সুরক্ষা’। এ বছর, অর্থাৎ ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, শিক্ষায় ছাত্র-শিক্ষকের যৌথ অংশগ্রহণে তারুণ্যের শক্তি।
এই প্রতিপাদ্য একটি সনাতন ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে। এতদিন ধরে ভাবা হতো, নীতিনির্ধারক ও শিক্ষাবিদরাই শিক্ষা ব্যবস্থা ঠিক করবেন, আর শিক্ষার্থীরা তা অনুসরণ করবে। এবার জাতিসংঘ তরুণদের কেবল শিক্ষার্থী নয় বরং নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার সক্রিয় অংশীদার ও সহ-নির্মাতা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশনের এই যুগে তরুণরাই সবচেয়ে ভালো জানে, তাদের কী শেখা প্রয়োজন এবং কীভাবে শেখা প্রয়োজন। কারিকুলাম তৈরি থেকে শুরু করে শিক্ষা পদ্ধতির আধুনিকায়নে শিক্ষার্থীদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। তরুণদের উদ্ভাবনী চিন্তা ও ডিজিটাল দক্ষতা শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও প্রাণবন্ত ও প্রাসঙ্গিক করে তুলবে, এমনটাই মনে করছে জাতিসংঘ।
বৈশ্বিক বাস্তবতা ও আগামীর চ্যালেঞ্জ
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবসের গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক মন্দা শিক্ষা খাতকে বড় ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
এ ছাড়া প্রযুক্তিগত বৈষম্য বা ‘ডিজিটাল ডিভাইড’ এর কারণে ধনী ও দরিদ্র দেশের মধ্যে শিক্ষার মানের ব্যবধান বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত পৃথিবীর শেষ শিশুটিও শিক্ষার আওতায় না আসছে, ততক্ষণ এই লড়াই শেষ হবে না। আজকের তরুণরা কেবল সমস্যার ভুক্তভোগী নয়, তারা সমাধানেরও উৎস। শিক্ষা ব্যবস্থার নীতিনির্ধারণ ও পরিবর্তনে তাদের যুক্ত করলে একটি টেকসই ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন সম্ভব।
জানাও তোমার শিক্ষাজীবনে কোন অংশ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
আজ আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবসে এক মুহূর্ত থেমে ভাব,
তোমার জীবনে কোন শিক্ষক বা শিক্ষিকা তোমাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছে? যাঁর একটি কথা, একটি উৎসাহ কিংবা একটি শাসন আপনার জীবনপথ বদলে দিয়েছে?আজই তাঁকে একটি ফোন করতে পারো কিংবা, একটি বার্তা পাঠাও বা মনে মনে কৃতজ্ঞতা জানাতে পারো। একবার একটু সময় নিয়ে সতেজ মন ও মস্তিষ্কে ভেবে দেখো তো তোমার দীর্ঘ এই শিক্ষা জীবনে কোন অংশটি তোমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সবচেয়ে বেশি স্মৃতি বয়ে আনে। অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পারো তোমার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিংবা ভিন্নভাবে। এদিন শিক্ষাকে নানাভাবে স্মরণ করাই তো এর গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়।