/
/
/
যেভাবে ঘুরে দাঁড়ালেন তাঁরা/ লড়াই, অস্তিত্ব ও উত্তরণের গল্প
যেভাবে ঘুরে দাঁড়ালেন তাঁরা/ লড়াই, অস্তিত্ব ও উত্তরণের গল্প
Byলাল সবুজ প্রকাশ
Published৯ মার্চ, ২০২৬
৪:৫৬ অপরাহ্ণ
516646823_1181868137288453_5875725774706969096_n
লাল সবুজ প্রকাশ
বাংলাদেশের তারুণ্য নেতৃত্বাধীন উন্নয়ন-ভিত্তিক মিডিয়া প্লাটফর্ম লাল সবুজ প্রকাশ। শিশু-কিশোর-তরুণদের চোখে অধিকার, জলবায়ু, সমতা, ন্যায্যতা ও সত্যের গল্পের খোঁজে গ্রাম থেকে শহর, পাহাড় থেকে চরের কথা তুলে ধরি আমরা। তুলে ধরি তাদের সৃজনশীলতা, ছড়াই সচেতনতার বার্তা।

কনটেন্টটি শেয়ার করো

Copied!

সর্বশেষ

Women

পাহাড়ের চূড়ায় যখন কুয়াশা জমে, তখন সেখান থেকে সমতলের পথটা দেখা যায় না। লিলি প্রু মারমার জীবনটাও একটা সময় তেমনই ছিল। রাঙামাটির এক সাধারণ পরিবার থেকে আসা একটি মেয়ের জন্য ঢাকার ব্যস্ত রাস্তা কিংবা জাতীয় পর্যায়ের নীতি নির্ধারণী কক্ষগুলো ছিল কল্পনার অতীত। কিন্তু আজ লিলি কেবল সমতলে নিজের জায়গা করে নেননি, তিনি হয়ে উঠেছেন YDSB-এর মতো একটি প্রভাবশালী জাতীয় যুব সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক।

লিলির লড়াইটা ছিল অনেকটা দুধারী তলোয়ারের ওপর দিয়ে হাঁটার মতো। বাঙালির সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করা নিয়ে নিজ সম্প্রদায়ের ভেতরে তাঁকে অনেক কথা শুনতে হয়েছে ; আর সমতলে তাঁকে লড়তে হয়েছে নিজের জাতিগত পরিচয়ের কারণে তৈরি হওয়া এক অদৃশ্য দেয়ালের সাথে।

“আমার সামনে পথ দেখানোর মতো কোনো আদিবাসী নারী ছিলেন না,” লিলি বলছিলেন তাঁর শুরুর দিনগুলোর কথা। আজ তিনি সেই সব মেয়েদের জন্য বড় এক উদাহরণ, যারা পাহাড়ের গণ্ডি পেরিয়ে বড় স্বপ্ন দেখার সাহস পায় না।

লিলির সেই নীরব বিপ্লব যখন পাহাড়ে ঢেউ তুলছে, ঠিক তখন ঢাকার মোহাম্মদপুরে আর এক কিশোরী লড়ছিলেন এক নিশ্চিত সামাজিক প্রথার বিরুদ্ধে।

নাম তাঁর আনিকা। কয়েক বছর আগে যখন তাঁর পড়াশোনা আর নিজেকে চেনার বয়স, তখন ঘরে চলছিল তাঁর বিয়ের তোড়জোড়। আমাদের সমাজে বিয়ের নাম করে মেয়েদের ডানা ছেঁটে দেওয়ার যে চিরাচরিত চল, আনিকা তার শিকার হতে চাননি। তিনি সেই বাল্যবিবাহ এবং পরিবারের চাপকে সরাসরি ‘না’ বলে দিলেন। তবে সেই জেদ তাঁকে শুধু ঘরে বসে থাকতে দেয়নি। তিনি জানতেন, নিজের পায়ে দাঁড়াতে না পারলে এই সমাজ তাঁকে শান্তি দেবে না।

তিনি শুরু করলেন নিজের উদ্যোগ— ‘গয়না সুন্দরী’ (Goynashundori)। আজ আনিকা আর সেই অসহায় কিশোরী নন। তাঁর গয়না এখন ফেসবুকের দেয়াল পেরিয়ে হাতিরঝিল থেকে শুরু করে রাজধানীর প্রধান মোড়গুলোতে ক্রেতাদের হাতে পৌঁছাচ্ছে। আনিকার বিশেষত্ব হলো, তিনি শুধু নিজের ভাগ্য বদলাননি; তাঁর এই প্রচেষ্টায় আজ আরও অনেক নারী কাজ করছেন। যে মেয়েটি একদিন নিজের অমতে বিয়ে করতে রাজি হননি, তিনি আজ অন্যদের স্বাবলম্বী হওয়ার সাহস জোগাচ্ছেন। তাঁর মাসিক লাখ টাকার আয় এখন স্রেফ সংখ্যা নয়, বরং তাঁর স্বাধীনতার প্রতীক।

এই মিছিলে তৃতীয় যে নামটি আসে, তাঁর লড়াইটা ছিল সমাজের চেয়েও বেশি নিজের শরীরের সাথে। বরিশালের মৌ। ২০১৭ সালে যখন ক্যানসার তাঁর শরীরে বাসা বাঁধে, তখন মনে হয়েছিল জীবনের সব আলো নিভে যাবে। দীর্ঘ সাত বছর যমদূতকে পাশ কাটিয়ে তিনি ফিরে এসেছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর শরীর আগের মতো ছিল না। পেশায় তিনি ছিলেন একজন নিপুণ মেহেদি শিল্পী, কিন্তু ক্যানসার পরবর্তী দুর্বল শরীর ঘণ্টার পর ঘণ্টা একভাবে বসে থাকার ধকল নিতে পারল না।

মৌ হার মানলেন না। মেহেদির সূক্ষ্ম কাজ ছেড়ে তিনি বেছে নিলেন রান্নাঘরের তাপ। শুরু করলেন ঘরোয়া খাবারের ক্যাটারিং ব্যবসা। “আমি যখন রান্না করি, তখন ভুলে যাই যে আমি একজন ক্যানসার জয়ী। মনে হয় আমি স্রেফ একজন রাঁধুনি,” মৌ-এর গলায় তখন জীবন জয়ের তৃপ্তি। বরিশালের রান্নাঘর থেকে আজ তিনি প্রমাণ করছেন যে, টিকে থাকার অদম্য ইচ্ছা থাকলে কোনো শারীরিক অসুস্থতাই শেষ কথা নয়।

কেন সবাই আনিকা বা লিলি হতে পারে না?
এই তিনজনের সাফল্যের গল্প আমাদের অনুপ্রাণিত করে ঠিকই, কিন্তু এর আড়ালে একটা বড় প্রশ্ন থেকে যায়— কেন অনেক নারী মাঝপথে কাজ ছেড়ে দেন? কেন সবার গল্প আনিকা, লিলি বা মৌ এর মতো হয় না? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সময় এমন অনেকের সাথে আমার কথা হয়েছে যারা কাজ শুরু করেও শেষ করতে পারেননি। তাদের ব্যর্থতা আসলে মেধার অভাব নয়, বরং এক কাঠামোগত সংকট।

• অধিকাংশ নারী ঝরে পড়েন ঘরের ভেতর থেকে আসা চাপের কারণে। কাজ বাড়ার সাথে সাথে যখন বাড়িতে সময় একটু কম দেওয়া হয়, তখন পরিবার থেকে সেই কাজকে ‘বিলাসিতা’ বা ‘বাড়তি কাজ’ বলে বন্ধ করে দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করা হয়। আনিকা বা লিলির মতো সব প্রতিকূলতাকে ‘না’ বলার মানসিক শক্তি সবার থাকে না।
• মৌ বা আনিকা একটা পর্যায়ে আসতে পেরেছেন কারণ তাঁরা সাহসী ছিলেন এবং ঝুঁকি নিয়েছেন। কিন্তু যারা ঝরে পড়েছেন, তাদের বেশিরভাগেরই কোনো আর্থিক ব্যাকআপ ছিল না। বরং পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে বা অন্য কোনো আর্থিক সংকটে ব্যবসার জমানো পুঁজিটাই খরচ হয়ে যায়। এরপর নতুন করে শুরু করার মতো সম্বল তারা আর খুঁজে পান না।
• একাকীত্ব ও সঠিক নির্দেশনার অভাব: লিলি যখন পাহাড় থেকে একা এসেছিলেন, তখন তাঁর পাশে কেউ ছিল না। অনেক নারী মাঝপথে হাল ছেড়ে দেন কারণ তারা একা হয়ে যান। তাদের ভুলগুলো ধরিয়ে দেওয়ার মতো কোনো মেন্টর বা সহযোদ্ধা থাকে না। এই একাকীত্ব অনেক সময় মেধাবী উদ্যোক্তাদের অকালেই থামিয়ে দেয়।

লিলি প্রু মারমার নেতৃত্ব, আনিকার ‘গয়না সুন্দরী’ আর মৌ-এর হাতের রান্না—এসব কিছুই আসলে নতুন এক বাংলাদেশের জয়গান। তাঁরা প্রমাণ করেছেন যে, প্রতিকূলতা যত বড়ই হোক, নিজের ওপর বিশ্বাস থাকলে এবং সঠিক সময়ে ‘না’ বলতে জানলে, শেষ পর্যন্ত সফলতা আপনি দেখবেন। আজকের এই নারী দিবসে তাঁদের গল্পগুলো কেবল অনুপ্রেরণা নয়, বরং আমাদের সমাজের জন্য এক নতুন শিক্ষা।