

একটি প্রজন্মের শৈশবজুড়ে ছিল ছোট্ট এক মেয়ের সাহস, বুদ্ধিমত্তা আর মানবিকতার গল্প। নব্বইয়ের দশক থেকে দুই হাজার সালের শুরুর দিকে বেড়ে ওঠা শিশুদের কাছে ‘মীনা’ শুধু একটি কার্টুন চরিত্র নয়, বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সমতা ও মানবিক মূল্যবোধের এক অনন্য প্রতীক। প্রায় দুই দশকের বিরতির পর আবারও নতুন রূপে ফিরছে সেই প্রিয় মীনা।
সম্প্রতি ইউনিসেফ জানিয়েছে, চলতি বছরের শেষ নাগাদ বাংলাদেশের শিশুদের জন্য নতুনভাবে ‘মীনা’কে উপস্থাপন করা হবে। ইউনিসেফের চিফ অব কমিউনিকেশন অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি মিগেল ম্যাতেওস মুনোজের ভাষ্য, শিক্ষা, পুষ্টি, স্বাস্থ্য, শিশু সুরক্ষা, নিরাপদ পানি ব্যবহার এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে আবারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এই জনপ্রিয় চরিত্র।
‘মীনা’র যাত্রা শুরু হয় ১৯৯১ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত সার্ক ঘোষিত মেয়েশিশু দশক উপলক্ষে। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের শিশুদের জন্য ইউনিসেফ তৈরি করে অ্যানিমেটেড সিরিজটি। বাংলাদেশে ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হয় প্রথম পর্ব ‘মুরগিগুলো গুনে রাখো’। খুব অল্প সময়েই মীনা, তার ভাই রাজু এবং টিয়া পাখি মিঠু কোটি শিশু-কিশোরের প্রিয় চরিত্রে পরিণত হয়।
বাংলাদেশে ‘মীনা’র প্রথম পর্বের লেখক ছিলেন ইউনিসেফের তৎকালীন কর্মকর্তা শামসুদ্দীন পেয়ারা। তাঁর মতে, মেয়েশিশুর শিক্ষা, অধিকার ও মর্যাদা সম্পর্কে সমাজে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যেই চরিত্রটির জন্ম। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের বাস্তবতা ও মতামতের ভিত্তিতে মীনার গল্প ও চরিত্র নির্মাণ করা হয়েছিল।
মজার বিষয় হলো, শুরুতে মীনার সঙ্গী হিসেবে টিয়া পাখি মিঠুর পরিবর্তে একটি বানর রাখার পরিকল্পনা ছিল। পরে সেই ভাবনা বদলে টিয়া পাখি মিঠুকে যুক্ত করা হয়। ধারাবাহিক পরিমার্জনের মাধ্যমে মীনা এমন একটি চরিত্রে পরিণত হয়, যার সঙ্গে বাংলাদেশের শিশুরা সহজেই নিজেদের মিল খুঁজে পেত।
বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের শহরের প্রায় ৯৭ শতাংশ এবং গ্রামের ৮১ শতাংশ শিশু-কিশোর ‘মীনা’কে চিনত। শুধু বিনোদন নয়, হাত ধোয়ার অভ্যাস, টিকাদান, শিক্ষার গুরুত্ব, লিঙ্গসমতা, শিশুর অধিকার ও সামাজিক সচেতনতার মতো বিষয়গুলোও একটি পুরো প্রজন্ম শিখেছে মীনার কাছ থেকে।
বর্তমান সময়ে শিশুদের বিনোদনের মাধ্যম বদলে গেলেও বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস, সময়োপযোগী গল্প, আধুনিক অ্যানিমেশন এবং নতুন প্রজন্মের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উপস্থাপন করা গেলে ‘মীনা’ আবারও শিশুদের প্রিয় হয়ে উঠবে। তাই দুই দশক পর এই প্রত্যাবর্তন শুধু একটি কার্টুন চরিত্রের ফেরা নয়, বরং নতুন প্রজন্মের কাছে মূল্যবোধ ও সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার এক নতুন সূচনা।