

বাংলাদেশে মুখগহ্বরের ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তামাক ও তামাকজাত দ্রব্যের ব্যাপক ব্যবহার, দেরিতে চিকিৎসা নেওয়া এবং সচেতনতার অভাব-এই তিনটি কারণই মুখের ক্যান্সার বৃদ্ধির প্রধান কারণ।
ক্যান্সার বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, ক্যান্সারে যত মানুষ মারা যায়, প্রায় সমসংখ্যক মানুষ চিকিৎসা নিতে দেরি করার কারণেও মৃত্যুবরণ করেন। অনেকের মনে এখনো ধারণা রয়েছে-ক্যান্সার মানেই মৃত্যু। অথচ বাস্তবে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে অধিকাংশ ক্যান্সারের সফল চিকিৎসা সম্ভব।
তামাকই মুখের ক্যান্সারের প্রধান কারণ
মুখগহ্বরের ক্যান্সারের সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাসের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তামাক ও তামাকজাত দ্রব্য মুখের কোষে ক্ষত সৃষ্টি করে এবং দীর্ঘদিন সেই ক্ষত থাকলে তা ক্যান্সারে রূপ নিতে পারে।
সিগারেট, বিড়ি, ই-সিগারেট, পান, সুপারি, চুন, জর্দা, গুল, খৈনী-এসবই মুখগহ্বর ও খাদ্যনালির ক্যান্সারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশে মুখগহ্বরের ক্যান্সারে আক্রান্ত প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রেই তামাক সেবনের ইতিহাস রয়েছে।
যারা নিয়মিত পান-জর্দা খান বা তামাকপাতা ব্যবহার করেন তাদের ঝুঁকি প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। আর ধূমপানের পাশাপাশি পান বা তামাকজাত পণ্য ব্যবহার করলে এই ঝুঁকি ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়।
দক্ষিণ এশিয়ায় কেন বেশি
শুধু বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশেই মুখের ক্যান্সারের হার তুলনামূলক বেশি। কারণ এই অঞ্চলে তামাক ও পান-জর্দা সেবনের প্রবণতা বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গত ২০ বছরে বাংলাদেশে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা প্রায় ১০ গুণ বেড়েছে। বর্তমানে দেশে প্রতি বছর প্রায় ২ লাখ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হন এবং প্রায় দেড় লাখ মানুষ মারা যান।
মুখগহ্বরের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে পুরুষদের আক্রান্ত হওয়ার হার ২২-২৩ শতাংশ, আর নারীদের ক্ষেত্রে ১৬-১৭ শতাংশ।
মুখের কোন স্থানে বেশি হয়
গবেষণা অনুযায়ী মুখগহ্বরের ক্যান্সার বিভিন্ন স্থানে হতে পারে-
জিহ্বা: প্রায় ২০%
ঠোঁট: প্রায় ১৫%
লালাগ্রন্থি: প্রায় ১০%
গলদেশ: প্রায় ২৫%
এছাড়া মাড়ি, তালু, টনসিল ও চোয়ালেও ক্যান্সার হতে পারে।
কীভাবে বুঝবেন মুখের ক্যান্সার হয়েছে কি না
মুখের ক্যান্সার সাধারণত শুরুতে তেমন বড় সমস্যা তৈরি করে না। তবে কিছু লক্ষণ দেখা দিলে সতর্ক হওয়া জরুরি-
মুখের ভেতরে এমন ঘা বা ক্ষত যা দীর্ঘদিনেও শুকায় না
ক্ষত থেকে সহজে রক্তপাত হওয়া
মুখের ভেতরে লাল বা সাদা দাগ দেখা যাওয়া
খাবার গিলতে কষ্ট হওয়া
গলায় কিছু আটকে থাকার অনুভূতি
জিহ্বা বা মাড়িতে ব্যথা বা অসাড়তা
চোয়াল নাড়াতে অসুবিধা
এই লক্ষণগুলো দেখা গেলেই ক্যান্সার হয়েছে এমন নয়। তবে ২-৩ সপ্তাহের মধ্যে ভালো না হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
প্রতিরোধই সবচেয়ে কার্যকর উপায়
বিশেষজ্ঞদের মতে, মুখগহ্বরের ক্যান্সারের চিকিৎসায় সাধারণত অস্ত্রোপচার, রেডিওথেরাপি ও কেমোথেরাপি ব্যবহার করা হয়। তবে রোগটি প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে চিকিৎসা অনেক সহজ হয়।
তাই প্রতিরোধের জন্য কয়েকটি বিষয় মেনে চলা জরুরি-
ধূমপান ও তামাকজাত পণ্য সম্পূর্ণ বর্জন করা
নিয়মিত মুখ ও দাঁতের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা
বছরে অন্তত একবার ডেন্টাল চেকআপ করা
পুষ্টিকর খাবার, ফলমূল ও শাকসবজি বেশি খাওয়া
অতিরিক্ত ঝাল বা খুব গরম খাবার এড়িয়ে চলা
মাদক ও অ্যালকোহল থেকে দূরে থাকা
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যান্সার মানেই মৃত্যু-এই ধারণা এখন আর সত্য নয়। সচেতনতা বাড়ানো এবং তামাক বর্জন করলে মুখের ক্যান্সারসহ অনেক ধরনের ক্যান্সারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।