

বাংলাদেশের স্থাপত্য ইতিহাসে এক অনন্য বিস্ময়ের নাম জাতীয় সংসদ ভবন। বিশ্বখ্যাত স্থপতি লুই ইসাডোর কান (লুই আই কান) এই অসাধারণ স্থাপনাটির নকশা প্রণয়ন করেন। তবে পছন্দসই উপকরণ না পাওয়ায় তার কিছু নান্দনিক পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হয়েছিল। পাকিস্তান শাসনামলে শুরু হওয়া এই ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয় স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর, ১৯৭৩ সালে। যদিও পরিপূর্ণ কাজ শেষ হতে সময় লাগে আরও কয়েক বছর।
১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান পাকিস্তানের রাজধানী করাচি থেকে ইসলামাবাদে স্থানান্তর করেন। একই সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে একটি ‘দ্বিতীয় রাজধানী’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ঢাকার শেরেবাংলা নগরে ৮৪০ একর জমির ওপর নতুন প্রশাসনিক শহর নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়, যার নামকরণ হয়েছিল ‘আইয়ুব নগর’।
প্রখ্যাত স্থপতি মাজহারুল ইসলাম আন্তর্জাতিক তিন স্থপতির নাম প্রস্তাব করেন—ল্য করব্যুজিয়ে, আলভার আইতো এবং লুই আই কান। বয়স ও ব্যস্ততার কারণে করব্যুজিয়ে ও আইতো সরে দাঁড়ান। প্রস্তাব গ্রহণ করেন লুই আই কান। ১৯৬২ সালে মৌখিক চুক্তির পর তিনি ঢাকায় আসেন। বাংলার লাল ইট, নদী, সবুজ প্রকৃতি ও আলো-ছায়ার বৈচিত্র্য তাকে মুগ্ধ করে। পাহাড়পুর থেকে আহসান মঞ্জিল—লাল ইটের ঐতিহ্য মাথায় রেখেই তিনি পরিকল্পনা শুরু করেন।
কানের পরিকল্পনায় ছিল শুধু সংসদ ভবন নয়; বরং একটি পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক শহর—ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি, সুপ্রিম কোর্ট, জনপ্রতিনিধিদের আবাসন, সরকারি কর্মকর্তাদের বাসস্থান, প্রেসিডেন্ট প্যালেস, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্টেডিয়াম। ১৯৬৩ সালের ১২ মার্চ তিনি প্রথম মাস্টারপ্ল্যান উপস্থাপন করেন এবং ১৯৬৪ সালে মূল নকশা জমা দেন। ১৯৬৫ সালে শুরু হয় নির্মাণকাজ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের কারণে কাজ বন্ধ থাকলেও স্বাধীনতার পর তা আবার শুরু হয় এবং ১৯৮৩ সালে পুরো প্রকল্প শেষ হয়।
তবে শেষ পর্যন্ত কানের স্বপ্নের পূর্ণাঙ্গ শহর বাস্তবায়িত হয়নি। মূলত সংসদ ভবন, লেক, হাসপাতাল ও কিছু আবাসিক অংশই টিকে থাকে।

জাতীয় সংসদ ভবনে রয়েছে মোট নয়টি ব্লক। অষ্টভুজাকৃতির কেন্দ্রীয় ব্লকটি মূল অ্যাসেম্বলি হল, যার চারপাশে আটটি অংশ। চারদিকে অফিস ব্লক, পশ্চিম পাশে মন্ত্রী ও আমলাদের কক্ষ এবং দক্ষিণে সামান্য পশ্চিমমুখী নামাজঘর।
কানের ধারণা ছিল—নামাজঘরের নিচ দিয়ে প্রবেশ করলে সংসদ সদস্যদের মনে পবিত্রতার অনুভূতি জাগ্রত হবে। দক্ষিণ প্লাজায় ঈদের জামাতও অনুষ্ঠিত হয়। উত্তর দিকে রয়েছে প্রেসিডেন্টস প্লাজা।
রোমান স্থাপত্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে কান প্যানথিয়নের মতো ওপরে থেকে আলো প্রবেশের ব্যবস্থা করেন। তার বিখ্যাত উক্তি—
“সূর্য নিজেও জানে না সে কত সুন্দর, যতক্ষণ না সে একটি ভবনের গায়ে পড়ে।”
দেয়ালে কাটা ত্রিভুজ ও বৃত্তাকার জ্যামিতিক নকশা আলো-ছায়ার অপূর্ব দৃশ্য সৃষ্টি করে। স্ক্রিন ওয়াল বাইরের রোদ-বৃষ্টি সরাসরি প্রবেশ ঠেকালেও আলো ও বাতাস চলাচল নিশ্চিত করে।
অষ্টভুজাকৃতির মূল হলরুমে ৩৫০ জন সংসদ সদস্যের বসার ব্যবস্থা রয়েছে। পশ্চিম পাশে স্পিকারের আসন। প্রায় ৭০ ফুট উঁচু হলের ওপর পাতলা কংক্রিট শেল কাঠামো দিয়ে প্রতিফলিত আলো দেয়াল বেয়ে নেমে আসে। পুরো ভবনে প্রচলিত কলাম ব্যবহার করা হয়নি, তবুও আলো পড়লে দেয়ালে কলামের ছায়া দেখা যায়—যা স্থাপত্যের এক অনন্য ভ্রম।

পিডব্লিউডির হিসাব অনুযায়ী, নির্মাণব্যয় ছিল প্রায় ২০০ কোটি টাকা—যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের জন্য যা ছিল বিশাল অঙ্ক। মোট ব্যয়ের সাত শতাংশ লুই আই কানকে প্রদান করা হয়। তবে ১৯৭৪ সালে ফিলাডেলফিয়ায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি। জাতীয় সংসদ ভবনই ছিল তার নকশা করা শেষ প্রকল্প।
২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৪০টি বাক্সে মূল নকশার চার সেট বাংলাদেশে আনা হয়। যদিও মূল নকশার সবকিছু বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি, তবুও জাতীয় সংসদ ভবন আজও বাংলাদেশের ঐতিহ্য, গৌরব ও স্থাপত্যসৌন্দর্যের অনন্য প্রতীক।
তথ্যসূত্র: সমতটে সংসদ বাংলাদেশের স্থাপত্য সংস্কৃতি লুই কা’ন ও সংসদ ভবন, মীর মোবাশ্বের আলী ও প্যারামেটিক আর্কিটেকচার