

ইতিহাস, বিবর্তন ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এক গভীর পর্যালোচনা
রাষ্ট্র পরিচালনার দৃশ্যপটে এমন একটি কাঠামো রয়েছে, যার সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হয় একটি দেশের ভবিষ্যৎ, অর্থনীতি, কূটনীতি ও প্রশাসনিক দিকনির্দেশনা। সেই কাঠামোর নাম মন্ত্রিসভা। সাধারণ মানুষের কাছে এটি হয়তো কেবল সংবাদ শিরোনামে দেখা একটি শব্দ, কিন্তু বাস্তবে এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু।
ইতিহাসের আয়নায় মন্ত্রিসভা
মন্ত্রিসভার ধারণার উৎপত্তি ইউরোপের রাজতান্ত্রিক যুগে। ১৭শ ও ১৮শ শতকে ব্রিটেনে রাজা তাঁর ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের নিয়ে একটি ছোট পরিষদ গঠন করতেন, যা ধীরে ধীরে “ক্যাবিনেট” নামে পরিচিত হয়। প্রথমদিকে এটি ছিল কেবল রাজাকে পরামর্শ দেওয়ার একটি সংস্থা।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটে, সংসদের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং রাজকীয় কর্তৃত্ব সীমিত হয়ে আসে। তখন থেকেই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্য থেকে গঠিত প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর মন্ত্রিসভা রাষ্ট্রের কার্যকর নির্বাহী ক্ষমতা হাতে নেয়। এই ব্রিটিশ সংসদীয় মডেল পরবর্তীতে বিশ্বের বহু দেশে অনুসৃত হয়।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ভিন্ন পথ অনুসরণ করা হয়। সেখানে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থায় প্রেসিডেন্ট নিজেই সরকারপ্রধান এবং তাঁর নিয়োগপ্রাপ্ত ক্যাবিনেট সদস্যরা আইনসভা থেকে পৃথক থাকেন। ফলে বিশ্বজুড়ে মন্ত্রিসভার কাঠামো শাসনব্যবস্থার ধরন অনুযায়ী ভিন্ন রূপ ধারণ করে।
কীভাবে কাজ করে মন্ত্রিসভা?
মন্ত্রিসভা মূলত সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সংস্থা। দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে।
প্রধানমন্ত্রী বা সরকারপ্রধান বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীরা তাঁদের প্রস্তাব ও নীতিমালা উপস্থাপন করেন। আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং তা বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেওয়া হয়।
সংসদীয় ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো “সমষ্টিগত দায়বদ্ধতা”। অর্থাৎ মন্ত্রিসভার একটি সিদ্ধান্তের জন্য সকল মন্ত্রী যৌথভাবে দায়ী থাকেন, এমনকি ব্যক্তিগতভাবে মতভেদ থাকলেও প্রকাশ্যে সেই সিদ্ধান্ত সমর্থন করতে হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মন্ত্রিসভা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মন্ত্রিসভার বিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তানে মন্ত্রিসভা থাকলেও কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা ও সামরিক হস্তক্ষেপের কারণে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের সংবিধানে বাংলাদেশ সংসদীয় শাসনব্যবস্থা গ্রহণ করে। সেখানে প্রধানমন্ত্রীকে সরকারপ্রধান এবং মন্ত্রিসভাকে রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।
তবে ১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা চালু হয়। পরবর্তীতে দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ১৯৯১ সালে পুনরায় সংসদীয় ব্যবস্থা ফিরে আসে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভাই রাষ্ট্র পরিচালনার মূল কেন্দ্র।
বাংলাদেশে সাধারণত তিন স্তরের মন্ত্রী নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠিত হয় পূর্ণমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত হন এবং তাঁর পরামর্শে অন্যান্য মন্ত্রী নিয়োগ পান।
অন্যান্য দেশের সঙ্গে পার্থক্য
বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যে মন্ত্রিসভা সরাসরি সংসদের কাছে দায়বদ্ধ। সরকার টিকে থাকে সংসদের আস্থার ওপর। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ও তাঁর ক্যাবিনেট নির্দিষ্ট মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন এবং কংগ্রেসের আস্থার ওপর তাঁদের পদ নির্ভর করে না।
এই পার্থক্যই সংসদীয় ও রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থার মৌলিক বিভাজন নির্দেশ করে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিসভা?
একটি দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা, বাজেট অনুমোদন, আন্তর্জাতিক চুক্তি, বড় অবকাঠামো প্রকল্প কিংবা সংকটকালীন সিদ্ধান্ত সবকিছুর পেছনে থাকে মন্ত্রিসভার ভূমিকা। অর্থনৈতিক সংকট, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় মন্ত্রিসভার দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মন্ত্রিসভার কার্যকারিতা নির্ভর করে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও নীতিনিষ্ঠতার ওপর। শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল মন্ত্রিসভা একটি দেশের গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে সুদৃঢ় করে।
শেষকথা
মন্ত্রিসভা কেবল একটি প্রশাসনিক কাঠামো নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার হৃদস্পন্দন। ইতিহাসের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজকের আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় এর ভূমিকা আরও সুসংগঠিত ও প্রাতিষ্ঠানিক হয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মন্ত্রিসভা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে কাজ করছে যার সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হয় দেশের আগামী দিনের পথচলা।