

“আমি যখন প্রথম অনলাইন ব্যবসা শুরু করি, তখন আমার হাতে বড় কোনো মূলধন ছিল না। ছিল শুধু একটি স্মার্টফোন, ইন্টারনেট সংযোগ আর নিজের ওপর বিশ্বাস।” এভাবেই নিজের যাত্রার গল্প শুরু করেছিল তরুণ উদ্যোক্তা রাফি । তার এ যাত্রার অভিজ্ঞতা কেবল একজনের গল্প নয় বরং এটি সময়ের হাজারো তরুণ-তরুণীর বাস্তবতা।
রাফি জানায়, আগে ব্যবসা মানেই ছিল দোকান ভাড়া, অগ্রিম মূলধন, কর্মচারী, অসংখ্য খরচ আর অনিশ্চয়তা। “আমি ভাবতাম ব্যবসা আমার জন্য না,” কিন্তু ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সেই ধারণা বদলে দেয়। সে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পেজ খুলে পণ্যের ছবি পোস্ট করে। “প্রথম অর্ডারটা যখন ইনবক্সে আসে, বিশ্বাসই করতে পারিনি,” বলে জানায় রাফি।
এরকম অভিজ্ঞতা শুধু রাফির একা নয়। বর্তমানে অসংখ্য তরুণ উদ্যোক্তা একইভাবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করছে। একটি পোস্ট মুহূর্তেই শত শত মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে যা আগে কল্পনাও করা যেত না। নারী উদ্যোক্তা, নুসরাত, বলে, “ঘরে বসেই আমি সারা দেশে পণ্য পাঠাতে পারছি এটা দশ বছর আগেও ভাবিনি।”
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর সীমাহীনতা। ভৌগোলিক সীমানা এখানে বাধা নয়। একজন উদ্যোক্তা ঢাকায় বসে চট্টগ্রাম, সিলেট বা রাজশাহীর ক্রেতার কাছ থেকে অর্ডার পাচ্ছে। এমনকি প্রবাসীরাও অনলাইনে পণ্য অর্ডার করছেন তাদের পরিবারের জন্য। “আপনার পেজের রিভিউ দেখেই অর্ডার করেছি” এই ধরনের মন্তব্য এখন প্রায় প্রতিদিনই শোনা যায়। ক্রেতাদের এই বিশ্বাস গড়ে ওঠে ডিজিটাল স্বচ্ছতার মাধ্যমে, ছবি, ভিডিও, লাইভ সেশন এবং খোলামেলা যোগাযোগের কারণে।
খরচ কমানোর দিক থেকেও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম যুগান্তকারী। দোকান ভাড়া নেই, আলাদা শোরুমের প্রয়োজন নেই। অর্ডার অনুযায়ী উৎপাদন বা সংগ্রহের মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো সম্ভব। তরুণ এক উদ্যোক্তা জানায়, “আমি ছোট পরিসরে শুরু করেছিলাম। অনলাইন না থাকলে এত কম খরচে শুরু করা সম্ভব হতো না।” এই কম বিনিয়োগের সুযোগ নতুন উদ্যোক্তাদের সাহস জোগাচ্ছে।
আবার ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাও ব্যবসাকে আরও সহজ করেছে। মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস যেমন বিকাশ,নগদ,রকেট এর মাধ্যমে মুহূর্তে পেমেন্ট পাওয়া যায়। আগে নগদ লেনদেনে যে অনিশ্চয়তা ছিল, এখন তা অনেকটাই কমেছে। একজন বিক্রেতা বলেন, “পেমেন্ট কনফার্মেশন আসার সঙ্গে সঙ্গে আমি পণ্য পাঠিয়ে দিই-সবকিছুই এখন দ্রুত আর স্বচ্ছ।”
নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বিশেষ ভূমিকা রাখছে। সামাজিক সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে অনেক নারী ঘরে বসেই সফল ব্যবসা পরিচালনা করছে। একজন উদ্যোক্তার ভাষায়, “এই প্ল্যাটফর্ম আমাকে শুধু আয় দেয়নি, আত্মসম্মানও দিয়েছে।” এই পরিবর্তন শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিকও।
অনলাইন ব্যবসা ঘিরে নতুন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। ডেলিভারি সার্ভিস, ডিজিটাল মার্কেটিং, কনটেন্ট ক্রিয়েশন, সব মিলিয়ে একটি নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠেছে। বড় ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম যেমন দারাজ এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে অনেকেই নিয়মিত আয় করছে। এটি প্রমাণ করে, ডিজিটাল অর্থনীতি এখন বাস্তব এবং শক্তিশালী।
তবে চ্যালেঞ্জও আছে। প্রতারণা, নকল পেজ, ডাটা নিরাপত্তা এসব বাস্তব সমস্যা । রাফি একবার নকল পেজের কারণে সমস্যায় পড়েছিল বলে জানায়। রাফি বলে “সেই অভিজ্ঞতা আমাকে আরও সতর্ক করেছে,”। সচেতনতা ও সঠিক নীতিমালার মাধ্যমে এসব ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
সবশেষে বলা যায়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম শুধু একটি ব্যবসার মাধ্যম নয়; এটি সম্ভাবনার দরজা। রাফির অভিজ্ঞতা, নুসরাতের সাফল্য এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে, যেখানে তরুণরা নিজেদের দক্ষতা ও পরিশ্রম দিয়ে অনলাইন জগতে জায়গা করে নিচ্ছে। তাদের গল্প প্রমাণ করে- ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম আজ শুধু প্রযুক্তি নয়, এটি স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার এক শক্তিশালী হাতিয়ার।