/
/
/
স্ল্যাক্টিভিজম ও ডিজিটাল প্রতিবাদ কি কেবল প্রতীকী সাহস?
স্ল্যাক্টিভিজম ও ডিজিটাল প্রতিবাদ কি কেবল প্রতীকী সাহস?
Byলাল সবুজ প্রকাশ
Published২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
৪:২২ অপরাহ্ণ
516646823_1181868137288453_5875725774706969096_n
লাল সবুজ প্রকাশ
বাংলাদেশের তারুণ্য নেতৃত্বাধীন উন্নয়ন-ভিত্তিক মিডিয়া প্লাটফর্ম লাল সবুজ প্রকাশ। শিশু-কিশোর-তরুণদের চোখে অধিকার, জলবায়ু, সমতা, ন্যায্যতা ও সত্যের গল্পের খোঁজে গ্রাম থেকে শহর, পাহাড় থেকে চরের কথা তুলে ধরি আমরা। তুলে ধরি তাদের সৃজনশীলতা, ছড়াই সচেতনতার বার্তা।

কনটেন্টটি শেয়ার করো

Copied!

সর্বশেষ

ChatGPT Image Feb 24, 2026, 04_18_10 PM

বর্তমান সময়ে ডিজিটাল বাংলাদেশে আমরা এক নতুন বাস্তবতায় বাস করছি। হাতে স্মার্টফোন, আঙুলের ডগায় ইন্টারনেট, আর চোখের সামনে সারাক্ষণ স্ক্রল করতে থাকা এক বিশাল ভার্চুয়াল পৃথিবী। কোনো অন্যায়ের খবর দেখলাম, সঙ্গে সঙ্গে শেয়ার করলাম। কোনো মানবিক বিপর্যয় ঘটলো, প্রোফাইল ছবিতে কালো করলাম । কোনো আন্দোলন শুরু হলো, হ্যাশট্যাগ লিখে সংহতি জানালাম। প্রশ্ন হলো, এই কাজগুলো কি সত্যিই পরিবর্তন আনে, নাকি আমরা কেবল নিজেদের কাছে দায়মুক্ত হই?

এই প্রেক্ষাপটেই আলোচনায় আসে “স্ল্যাক্টিভিজম”। শব্দটি এসেছে ‘Slacker’ (অলস) ও ‘Activism’ (সক্রিয়তা) থেকে। অর্থাৎ এমন এক ধরনের সক্রিয়তা যেখানে প্রচেষ্টা কম কিন্তু নৈতিক সন্তুষ্টি বেশি। লাইক, শেয়ার, রিঅ্যাক্ট, অনলাইন পিটিশনে সই সবই যেন প্রতিবাদের সহজ সংস্করণ। কিন্তু সহজ মানেই কি অকার্যকর? নাকি এটিই পরিবর্তনের প্রথম ধাপ?

বাংলাদেশে সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যুগুলোতে সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই। নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, কোটা সংস্কার আন্দোলন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদ, প্রতিটি ক্ষেত্রেই ফেসবুক হয়ে উঠেছে জনমত তৈরির গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। রাস্তায় নামা সবার পক্ষে সম্ভব না হলেও অনলাইনে প্রতিক্রিয়া জানানোর সুযোগ সবার জন্য উন্মুক্ত।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আমান উল্লাহ বলে,“ফেসবুকে কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদে স্ট্যাটাস দিলে বা প্রোফাইল পিকচার বদলালে মনে হয় আমি চুপ নেই। কিন্তু মাঝেমধ্যে ভাবি, এই লাইক-শেয়ার কি আসলেই কোনো পরিবর্তন আনছে?”

এই প্রশ্নটাই আসল। কারণ, স্ল্যাক্টিভিজম একদিকে যেমন জনমত গড়ে তোলে, অন্যদিকে এটি অনেক সময় প্রতিবাদকে ‘ট্রেন্ড’-এ পরিণত করে। আজ যে ইস্যু ট্রেন্ডিং, কাল সেটি হারিয়ে যায় নতুন কোনো ভাইরাল ঘটনার ভিড়ে। ফলে প্রতিবাদ স্থায়ী রূপ পায় না।

স্ল্যাক্টিভিজমের সবচেয়ে বড় সমালোচনা হলো এটি মানুষকে এক ধরনের মোরাল স্যাটিস্ফিকশন দেয়। এক্ষেত্রে আমরা অনেকেই মনে করে, “আমি তো পোস্ট দিয়েছি, আমার দায়িত্ব শেষ।” বাস্তবে হয়তো আমরা আর কোনো পদক্ষেপ নিই না।

ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট (ডিএসএ) ও সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট এর মতো আইনও অনেককে অনলাইনে সীমিত প্রতিবাদে অভ্যস্ত করে তুলেছে। সরাসরি মাঠে নামার ঝুঁকি না নিয়ে অনেকে নিরাপদ ডিজিটাল সমর্থনে থেমে যান। এতে প্রতিবাদ থাকে, কিন্তু চাপ তৈরি হয় না।

তবে এটাও সত্য, সবার পক্ষে সরাসরি আন্দোলনে অংশ নেওয়া সম্ভব নয়। ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা, নিরাপত্তা ঝুঁকি, সামাজিক বাধা সব মিলিয়ে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম অনেকের জন্য একমাত্র ভরসা। তাই স্ল্যাক্টিভিজমকে একেবারে বাতিল করাও যায় না।

স্ল্যাক্টিভিজমকে যদি আমরা পরিবর্তনের শেষ ধাপ হিসেবে দেখি, তাহলে এটি হতাশাজনক। কিন্তু যদি এটিকে প্রথম ধাপ হিসেবে দেখি, তাহলে এর সম্ভাবনা বিশাল। একটি পোস্ট কখনো কখনো হাজার মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। একটি হ্যাশট্যাগ গণমাধ্যমকে বিষয়টি কভার করতে বাধ্য করে। প্রশাসনও অনেক সময় জনচাপের মুখে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়। যেমন কয়েকবছর আগে যৌন হয়রানির শিকার হওয়া নারীরা অনলাইন জগতে নিজেদের নিপীড়নের কথা #MeToo দিয়ে প্রকাশ করেছিল যার কার্যকারিতা ও ফলাফল পরবর্তীতে আমরা দেখতে পাই। আবার নিরাপদ সড়ক আন্দোলনেও বেশকিছু হ্যাশট্যাগ কিংবা অন্যান্য বিষয়ে অনলাইন এক্টিভিজমের ফল আমরা দেখেছি।

অর্থাৎ ডিজিটাল প্রতিবাদ হলো স্ফুলিঙ্গ, আগুন জ্বালানোর জন্য যথেষ্ট কিন্তু জ্বলন্ত আগুনকে জ্বালানি দিতে হয় মাঠপর্যায়ের কাজ দিয়ে। অনলাইন সচেতনতা আর অফলাইন কর্মসূচির সমন্বয়ই প্রকৃত পরিবর্তনের চাবিকাঠি।