

ডিজিটাল বিপ্লবের এই সময়ে কিশোরদের জীবন এখন স্মার্টফোনের কাঁচের পর্দায় বন্দী। সকালের অ্যালার্ম থেকে শুরু করে গভীর রাতের চ্যাটিং, স্মার্টফোন এখন তাদের পড়াশোনা, বিনোদন এবং দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ডিজিটাল ডেমোক্রেসির এই স্বর্ণযুগে তথ্যের অবারিত সুযোগ যেখানে ক্ষমতায়নের কথা ছিল, সেখানে এখন প্রশ্ন উঠছে প্রযুক্তি কি কিশোরদের মুক্ত করছে, নাকি এক অদৃশ্য অ্যালগরিদমের দাসে পরিণত করছে?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভিডিও প্ল্যাটফর্মগুলো এখন আর কেবল তথ্য বিনিময়ের মাধ্যম নয়, এগুলো অত্যন্ত জটিল গাণিতিক ‘অ্যালগরিদম’ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ডিজিটাল মিডিয়ার প্রতিটি লাইক, কমেন্ট বা শেয়ার কিশোরদের মস্তিষ্কে ‘ডোপামিন’ নামক এক হরমোনের নিঃসরণ ঘটায়, যা এক ধরনের ক্ষণস্থায়ী নেশা তৈরি করে। গবেষণায় দেখা গেছে, একজন কিশোর গড়ে দিনে ৫ থেকে ৭ ঘণ্টা স্ক্রিনে কাটায়। এবং অ্যালগরিদম তাদের পছন্দ বিশ্লেষণ করে নিরন্তর একই ধরনের কন্টেন্ট সরবরাহ করে, যা তাদের একটি নির্দিষ্ট চিন্তার বৃত্তে আটকে রাখে। এর ফলে ভিন্নমত ও সৃজনশীল চিন্তার মতো গণতান্ত্রিক মূল্যবোধগুলো প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে পড়ছে। কিশোররা বাস্তব জগতের সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার বদলে ভার্চুয়ালি নিজেকে উপস্থাপনে বেশি মগ্ন থাকছে।
তবে এখানে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ডিজিটাল ডেমোক্রেসি কিশোরদের সামনে খুলে দিয়েছে এক বিশ্বজয়ের দুয়ার। বর্তমানে অনেক কিশোর এই মাধ্যমকে ব্যবহার করে তাদের ব্যক্তিগত এবং সামাজিক জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তনও আনছে। যেমন
অনলাইন ক্যাম্পেইন: জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বা নিরাপদ সড়কের দাবিতে কিশোরদের অনলাইন আন্দোলন নীতিনির্ধারকদের বাধ্য করছে নতুন করে ভাবতে।
স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম: বাংলাদেশে অনেক কিশোর অ্যাপ বা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে রক্তদান, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা বা ত্রাণ বিতরণের মতো কাজ করছে এবং নেতৃত্ব দিচ্ছে।
অর্থাৎ, প্রযুক্তি যখন আসক্তির বদলে প্রতিবাদের ভাষা বা সেবার মাধ্যম হয়, তখনই ডিজিটাল গণতন্ত্রের প্রকৃত উদ্দেশ্য সফল হয়।
তবে নিরাপদ খেলার মাঠের অভাব এবং শহুরে জীবনের একাকীত্ব শিশু-কিশোরদের প্রতিনিয়ত আরও বেশি মোবাইল-নির্ভর করে তুলছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকরা ব্যস্ততার কারণে সন্তানদের হাতে ফোন তুলে দিয়ে তাদের ডিজিটাল জগতের একাকী অভিযাত্রী বানিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন, প্রযুক্তি ব্যবহারে আমাদের স্বাধীনতা থাকলেও দায়িত্বশীলতার শিক্ষা কিন্তু পরিবার থেকেই শুরু হতে হয়।
এছাড়া কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উপর থেকে এই নির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠতে স্কুল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোরও অগ্রণী ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন। কেবল পাঠ্যবই নয়, প্রতিটি স্কুলে ‘ডিজিটাল সিটিজেনশিপ গাইডলাইন’ বা ডিজিটাল নাগরিকত্বের নীতিমালা থাকা জরুরি যাতে শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তিকে জ্ঞান অর্জনের সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, আসক্তি হিসেবে নয়।