/
/
ডিজিটাল ডেমোক্রেসি : গুরুত্ব ও প্রয়োজন
ডিজিটাল ডেমোক্রেসি : গুরুত্ব ও প্রয়োজন
Byলাল সবুজ প্রকাশ
Published২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
৯:১৪ পূর্বাহ্ণ
516646823_1181868137288453_5875725774706969096_n
লাল সবুজ প্রকাশ
বাংলাদেশের তারুণ্য নেতৃত্বাধীন উন্নয়ন-ভিত্তিক মিডিয়া প্লাটফর্ম লাল সবুজ প্রকাশ। শিশু-কিশোর-তরুণদের চোখে অধিকার, জলবায়ু, সমতা, ন্যায্যতা ও সত্যের গল্পের খোঁজে গ্রাম থেকে শহর, পাহাড় থেকে চরের কথা তুলে ধরি আমরা। তুলে ধরি তাদের সৃজনশীলতা, ছড়াই সচেতনতার বার্তা।

কনটেন্টটি শেয়ার করো

Copied!

সর্বশেষ

ChatGPT Image Feb 24, 2026, 09_34_02 AM

একসময় নাগরিকরা তাদের মতামত প্রকাশ করতেন মাঠের সভায়, পত্রিকার সম্পাদকীয়তে অথবা সরকারি অফিসে জমা দেওয়া আবেদনের মাধ্যমে। তবে আজকের পৃথিবীতে সব কিছু পাল্টে গেছে। এখন একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট, একটি লাইভ ভিডিও, অথবা অনলাইনে জমা দেওয়া অভিযোগও নীতিনির্ধারকদের নজর কেড়ে নিতে পারে।

এই পরিবর্তন কেবল প্রযুক্তিগত নয় বরং এটি নাগরিক অংশগ্রহণের ধরনই পাল্টে দিয়েছে। এখন মানুষ চাইলে মুহূর্তের মধ্যে তাদের সমস্যা তুলে ধরতে পারে, সরকারি সিদ্ধান্তের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এবং জনগণকে সরাসরি অংশগ্রহণে যুক্ত করতে পারে। এই নতুন বাস্তবতাকে আমরা “ডিজিটাল ডেমোক্রেসি” হিসেবে উল্লেখ করি বা বলি।

শেরি টার্কল বলেছেন, টেকনোলজি ডাসন্ট জাস্ট চেঞ্জ হোয়াট উই ডু; ইট চেঞ্জ হুই উই আর’  অর্থাৎ  প্রযুক্তি শুধু আমাদের কাজকে সহজ করে না, এটি আমাদের সমাজ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকেও পরিবর্তিত করে। তবে প্রযুক্তি নিজেই কোনো জাদুর কাঠি নয়। যদি নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা এবং ন্যায্যতার মানদণ্ড না থাকে, ডিজিটাল ব্যবস্থাই আবার বিভ্রান্তি এবং বৈষম্য বৃদ্ধি করতে পারে।

ডিজিটাল ডেমোক্রেসি কী?

ডিজিটাল ডেমোক্রেসি বলতে বোঝায় এমন একটি সমাজ যেখানে নাগরিকরা প্রযুক্তির মাধ্যমে সরকারের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করতে পারে। তারা তথ্য জানতে পারে, মতামত প্রকাশ করতে পারে, কোনো সমস্যার সমাধানের জন্য সরকারি বা সামাজিক পদক্ষেপের অংশ হতে পারে।

এটি শুধুমাত্র নির্বাচনের সময় সীমাবদ্ধ নয়। বাস্তবে, নাগরিকরা এখন প্রতিদিনের সেবা, তথ্য অধিকার, জনপরামর্শ, অভিযোগ দাখিল এবং জবাবদিহিতার জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে। উদাহরণস্বরূপ, ঢাকা শহরে এখন নাগরিকরা অনলাইনে ট্রাফিক লঙ্ঘন রিপোর্ট করতে পারে, পানি ও বিদ্যুৎ সংক্রান্ত সমস্যার জন্য দ্রুত অভিযোগ করতে পারে, এবং সরকারি সেবা ট্র্যাক করতে পারে। এই প্রক্রিয়া আগের তুলনায় অনেক দ্রুত, সহজ, এবং স্বচ্ছ।

সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারের নতুন ইনিশিয়েটিভ ‘নাগরিক সেবা’ প্রদক্ষিণ করেন নাইম সিকদার। তিনি জানান, একটি মাত্র ডিজিটাল প্লাটফর্মে এসে তিনি নানা ধরনের সুবিধা নিতে পারছেন। ‘বিদ্যুৎ সমস্যা, ইউটিলিটি বিল থেকে শুরু করে সকল সেবা নিতে পা্রছি এবং একই সাথে নিজের নাগরিক সেবা কতটুকু নিশ্চিত হচ্ছে তা দেখতে, জানতে ও বুঝতে পারছি। কোনো অপ্রত্যাশিত কিছু হলে তা দ্রুত ফিডব্যাকও দিতে পারছি একটি ক্লিকেই।‘ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

কেন এখন জরুরি?

ডিজিটাল ডেমোক্রেসি বর্তমানে সময়োপযোগী হওয়ার বেসঘ কিছু কারণ রয়েছে, তবে এর তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমত, মানুষের দৈনন্দিন জীবন এখন মোবাইল এবং ইন্টারনেটের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। তাই নাগরিকদের প্রত্যাশা আগের চেয়ে অনেক বেশি এবং দ্রুত সেবা চাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। দ্বিতীয়ত, প্রশাসনিক কাজের একটি বড় অংশ অনলাইনে চলে এসেছে। এটি নাগরিক অধিকার রক্ষার জন্য ডিজিটাল পথকে অপরিহার্য করেছে। তৃতীয়ত, অনলাইনে ভুল তথ্য, ঘৃণা ছড়ানো এবং হয়রানির ঘটনা বেড়ে গেছে। এগুলো গণতন্ত্রের আস্থাকে নড়বড়ে করতে পারে।

আবার ডিজিটাল ডেমোক্রেসি সঠিকভাবে কাজ করলে নাগরিক জীবনে অসংখ্য সুযোগ তৈরি হয়। প্রথমত, তথ্যের সহজ প্রবেশাধিকার নাগরিকদের সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেয়। এখন নাগরিকরা সরকারি নীতিমালা, বাজেট এবং সেবার তথ্য এক ক্লিকে পেতে পারে, যা আগের তুলনায় অনেক দ্রুত।

দ্বিতীয়ত, অংশগ্রহণের পথ সম্প্রসারিত হয়েছে। অনলাইন ফোরাম, সামাজিক মিডিয়া গ্রুপ, ডিজিটাল ক্যাম্পেইন এবং সার্ভে নাগরিকদের মতামত প্রকাশ এবং নীতি প্রক্রিয়ার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে। উদাহরণস্বরূপ, যখন কোনো স্থানীয় প্রকল্পের বিষয়ে পরামর্শের আয়োজন করা হয়, অনলাইনে প্রতিক্রিয়া দিয়ে মানুষ সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

তৃতীয়ত, জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পায়। অনলাইন অভিযোগ ব্যবস্থা, সেবা ট্র্যাকিং এবং প্রকাশযোগ্য তথ্য কর্তৃপক্ষকে দায়িত্বশীল থাকতে বাধ্য করে। নাগরিকরা দেখতে পারে কোন দফতর কেমন সেবা দিচ্ছে এবং কীভাবে সমস্যা সমাধান করছে।

সর্বশেষ, সময় এবং খরচ বাঁচে। দূরবর্তী অঞ্চলের মানুষও ঘরে বসে তথ্য ও সেবা পেতে পারে। এটি শুধু সুবিধা নয়, এটি অংশগ্রহণের জন্য সমান সুযোগও নিশ্চিত করে।

ঝুঁকি  সীমাবদ্ধতা

তবে ডিজিটাল ডেমোক্রেসির পথ সুগম নয়। প্রথমত, প্রপাগান্ডা এবং ভুয়া খবর মানুষকে বিভ্রান্ত করে এবং সামাজিক বিভাজন বাড়ায়।দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল বিভাজন একটি বড় বাধা। ইন্টারনেট, ডিভাইস, দক্ষতা এবং ভাষাগত সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক মানুষ অংশগ্রহণের বাইরে থাকতে পারে।

তৃতীয়ত, প্রাইভেসি এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে নাগরিক আস্থা নষ্ট হয়। তথ্য ফাঁস বা অনলাইন হয়রানি মানুষের ডিজিটাল অংশগ্রহণকে ভয়ানক করে তুলতে পারে। বিশেষ করে নারী, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বেশি ঝুঁকিতে থাকে।সুতরাং, প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক না কেন, নিরাপদ এবং ন্যায্য ব্যবস্থার প্রয়োজন।

উদাহরণ হিসেবে কিছুদিন আগে দিপু দাসকে হত্যার  বিষয়টি সামনে নিয়ে আসা যেতে পারে। এখানে একজন মানুষের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধভাবে সাম্প্রদায়িক অপতথ্য ছড়ানো হয় এবং বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি করে নিজেদের একান্ত মত প্রকাশ করে তার বিরুদ্ধে জনমত গঠন করার চেষ্টা করে তাকে হত্যাযোগ্য করে তোলা হয় বলে অনেকেই অভিযোগ করেন।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশে ডিজিটাল ডেমোক্রেসির গুরুত্ব । একদিকে, ডিজিটাল সেবা নাগরিক সুবিধা বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে, তথ্যের গুণমান, প্রাইভেসি, এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও বেড়ে চলেছে।

যেমন, অনেক মানুষ অনলাইনে সরকারি সেবা বা অভিযোগ করতে আগ্রহী, কিন্তু তারা ভয় পান যে তাদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত আছে কিনা। এই বাস্তবতায় লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে প্রযুক্তি নাগরিকবান্ধব হবে, স্বচ্ছতা থাকবে এবং আস্থা তৈরি হবে।

করণীয়দায়িত্ব কার কার

ডিজিটাল ডেমোক্রেসি শক্ত করার জন্য তিনটি প্রধান পক্ষের দায়িত্ব রয়েছে: রাষ্ট্র, প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম এবং নাগরিক সমাজ।

রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে স্বচ্ছ তথ্যপ্রকাশ, সেবা ট্র্যাকিং, এবং ডেটা সুরক্ষা। প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মকে সতর্ক থাকতে হবে ভুল তথ্য এবং হেইট স্পিচ নিয়ন্ত্রণে, এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নাগরিক সমাজ ও ব্যক্তিকে অবশ্যই তথ্য যাচাই, ভদ্র আচরণ এবং ডিজিটাল দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে।একজন সচেতন নাগরিক জানে কিভাবে ফ্যাক্ট চেক করতে হয়, কীভাবে প্রাইভেসি সুরক্ষিত রাখা যায়, এবং কখন অনলাইনে মত প্রকাশ করা উচিত। এটাই ডিজিটাল ডেমোক্রেসির সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।