/
/
/
মত প্রকাশ না হয়রানি? সামাজিক মাধ্যমে সীমারেখা কোথায়?
মত প্রকাশ না হয়রানি? সামাজিক মাধ্যমে সীমারেখা কোথায়?
Byলাল সবুজ প্রকাশ
Published২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
৯:১৮ পূর্বাহ্ণ
516646823_1181868137288453_5875725774706969096_n
লাল সবুজ প্রকাশ
বাংলাদেশের তারুণ্য নেতৃত্বাধীন উন্নয়ন-ভিত্তিক মিডিয়া প্লাটফর্ম লাল সবুজ প্রকাশ। শিশু-কিশোর-তরুণদের চোখে অধিকার, জলবায়ু, সমতা, ন্যায্যতা ও সত্যের গল্পের খোঁজে গ্রাম থেকে শহর, পাহাড় থেকে চরের কথা তুলে ধরি আমরা। তুলে ধরি তাদের সৃজনশীলতা, ছড়াই সচেতনতার বার্তা।

কনটেন্টটি শেয়ার করো

Copied!

সর্বশেষ

ChatGPT Image Feb 24, 2026, 09_50_28 AM

বাস্তব জীবনের রাস্তায় কেউ যদি আপনাকে ধাক্কা দেয়, আপনি প্রতিবাদ করতে পারেন। কিন্তু ডিজিটাল জগতে পরিস্থিতি অনেক জটিল। আক্রমণকারীরা অচেনা, ছদ্মনাম ব্যবহার করে এবং কখনো কখনো সংগঠিতও থাকে। একটি পোস্ট, একটি মতামত বা একটি ছবি এগুলোর মাধ্যমেই শুরু হয় অদৃশ্য আক্রমণ। কটূক্তি, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য, ইনবক্সে হুমকি, মর্ফ করা ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার ভয়- সবই এখন সাধারণ ঘটনা।

বাংলাদেশে ডিজিটাল ব্যবহার গত এক দশকে অভূতপূর্ব হারে বেড়েছে। বৈশ্বিক গবেষণা সংস্থা স্ট্যাটিস্টা প্রকাশিত ‘ইন্টারনেট অ্যান্ড সোশ্যাল মিডিয়া ইউজারস ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ (ফেব্রুয়ারি ২০২৫) শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে ‘ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যায় বাংলাদেশ এখন বিশ্বে ১৫তম স্থানে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা  দেশে ১৩ কোটির বেশি ইন্টারনেট গ্রাহক এবং এর বড় অংশ মোবাইল ইন্টারনেটের উপর নির্ভরশীল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যবহারকারীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সংযোগের এই বিস্তার নিরাপদ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারেনি। বরং নাগরিক কণ্ঠ যত দৃশ্যমান হয়েছে, ততই বেড়েছে তাকে চুপ করানোর ডিজিটাল কৌশল।

২০২৩-২৪ সালের বিভিন্ন মানবাধিকার ও প্রযুক্তি সংস্থার প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নারী সাংবাদিক, শিক্ষার্থী, মানবাধিকারকর্মী এবং সামাজিক ইস্যুতে সক্রিয় তরুণীরা অনলাইন হয়রানির প্রধান লক্ষ্যবস্তু। এটি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত আক্রমণ নয় বরং সংগঠিত ট্রলিং ও চরিত্রহননের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রাজনৈতিক মেরুকরণ ও সামাজিক রক্ষণশীলতা এই প্রবণতাকে আরও তীব্র করছে।

ঢাকার এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী জানান, সামাজিক ইস্যুতে মতামত দেওয়ার পর তাঁর ছবি বিকৃত করে ভুয়া অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। কয়েক দিনের মধ্যে বিষয়টি পরিবারের কাছে পৌঁছে যায়। মানসিক চাপে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সাময়িকভাবে সরে দাঁড়ান। এটি ব্যতিক্রম নয়; অনলাইন স্পেসে সক্রিয় বহু তরুণ তরুণীর  বাস্তবতা।

সাইবার বুলিংয়ের ধরন বহুমাত্রিক। কখনও এটি কটূক্তি বা অপমানের ভাষায় প্রকাশ পায়, কখনও ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস (ডক্সিং) করে ভয় দেখানো হয়, আবার কখনও মর্ফিং বা ডিপফেইক প্রযুক্তি ব্যবহার করে চরিত্রহননের মাধ্যমে আঘাত করা হয়। ফেসবুক বা ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মে অ্যালগরিদম বিতর্কিত ও উত্তেজনাপূর্ণ কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে দেয়, ফলে বিদ্বেষমূলক বার্তাও মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে যায়।

আইনি দিক থেকে বাংলাদেশে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন তৈরি করা হয়েছিল, যা পরে সাইবার সিকিউরিটি আইনে রূপ নেয়। এই আইনের মাধ্যমে অনলাইন হয়রানি, মানহানি, পর্নোগ্রাফি ও ডিজিটাল জালিয়াতির বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানো সম্ভব। এছাড়া বাংলাদেশ পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট এবং জাতীয় হেল্পলাইন নম্বরের মাধ্যমে ভুক্তভোগীরা সহায়তা চাইতে পারেন। তবে অভিযোগ প্রক্রিয়া জটিল মনে হওয়া, সামাজিক লজ্জা এবং আইনি জটিলতার আশঙ্কা অনেককে নিরুৎসাহিত করে। ফলে আইন থাকলেও কার্যকারিতা সচেতনতা ও প্রয়োগের স্বচ্ছতার ওপর নির্ভর করছে।

প্রতিরোধের প্রথম শর্ত হলো সচেতনতা। ডিজিটাল লিটারেসি শুধুই প্রযুক্তি ব্যবহার নয়; এটি ঝুঁকি চেনা, প্রাইভেসি রক্ষা এবং দায়িত্বশীল অংশগ্রহণের সক্ষমতা। স্কড়ে-কলেজ পর্যায়ে নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক হলে কিশোর-তরুণরা আগে থেকেই প্রস্তুত থাকতে পারবে। টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন, শক্তিশালী পাসওয়ার্ড, প্রাইভেসি সেটিংস নিয়ন্ত্রণ এবং সন্দেহজনক লিংক এড়িয়ে চলা মৌলিক চর্চা হলেও বড় ধরনের ক্ষতি কমাতে সাহায্য করে।

একই সঙ্গে প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি। দ্রুত রিপোর্টিং ব্যবস্থা, স্বচ্ছ কনটেন্ট মডারেশন এবং স্থানীয় ভাষাভিত্তিক মনিটরিং জোরদার করা না হলে সমস্যা কমবে না। নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকেও অনলাইন হয়রানিকে ব্যক্তিগত ‘ড্রামা’ নয়, বরং মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের ইস্যু হিসেবে তুলে ধরতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা হলো ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ানো। পরিবার, বন্ধু ও সহপাঠীদের সহমর্মিতা মানসিক পুনরুদ্ধারে বড় ভূমিকা রাখে। অনলাইন আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু ব্যক্তি একা নয়, এই বার্তাটি সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের মতামত তুলে ধরতে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। এ নিয়ে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের শিক্ষার্থী কারিমা ইসলাম বলেন, ‘অনলাইনে হয়রানি খুবই কমন একটি বিষয়। প্রথম দিকে বুঝতাম না কি করবো, নিজের পোস্ট বা ছবি ডিলিট করে দিতাম বাজে মন্তব্য দেখে। তবে এখন আমি এসবে এর পাত্তা দেই না। যে ব্যক্তি হয়রানি করে তার নামে রিপোর্ট করে ব্লক করে দিই। ফলে নেতিবাচক মন্তব্যের সংখ্যা এখন শূন্য।‘

অনলাইন জগতে বুলিং কিংবা হয়রানির শিকার হলে নানাভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন। সেক্ষেত্রে দ্রুত উক্ত আইডিতে রিপোর্ট করতে পারেন, অবস্থা বেশ জটিল হলে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন, সাইবার হেল্পলাইন ব্যবহার করা যেতে পারে(৯৯৯), নারীরা ফেসবুক পেজে (পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন) বা হটলাইন ০১৩২০০০০৮৮৮ এ যোগাযোগ করতে পারেন। ক্ষতিকর কন্টেন্ট বা ওয়েবসাইট বন্ধের জন্য বিটিআরসি-তে ইমেইল বা কল করতে পারেন ইত্যাদি।

ডিজিটাল স্পেস এখন নাগরিক কণ্ঠের নতুন মঞ্চ। কিন্তু যদি সেই মঞ্চ ভয়, অপমান ও হুমকিতে পূর্ণ হয়, তাহলে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনলাইন হয়রানি ও সাইবার বুলিং মোকাবিলা কেবল প্রযুক্তিগত বা আইনি চ্যালেঞ্জ নয়; এটি সামাজিক সংস্কৃতি ও নৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। স্ক্রিনের আড়ালে লুকানো সহিংসতা থামাতে হলে আমাদের সম্মিলিতভাবে বলতে হবে: ডিজিটাল নাগরিকত্ব মানে স্বাধীনতা, আর সেই স্বাধীনতার ভিত্তি হলো নিরাপত্তা ও মর্যাদা।