/
/
/
হ্যাশট্যাগের রাজনীতি: অনলাইনের কণ্ঠ, সচেতনতা ও সামাজিক প্রভাব
হ্যাশট্যাগের রাজনীতি: অনলাইনের কণ্ঠ, সচেতনতা ও সামাজিক প্রভাব
Byলাল সবুজ প্রকাশ
Published২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
৯:২৯ পূর্বাহ্ণ
516646823_1181868137288453_5875725774706969096_n
লাল সবুজ প্রকাশ
বাংলাদেশের তারুণ্য নেতৃত্বাধীন উন্নয়ন-ভিত্তিক মিডিয়া প্লাটফর্ম লাল সবুজ প্রকাশ। শিশু-কিশোর-তরুণদের চোখে অধিকার, জলবায়ু, সমতা, ন্যায্যতা ও সত্যের গল্পের খোঁজে গ্রাম থেকে শহর, পাহাড় থেকে চরের কথা তুলে ধরি আমরা। তুলে ধরি তাদের সৃজনশীলতা, ছড়াই সচেতনতার বার্তা।

কনটেন্টটি শেয়ার করো

Copied!

সর্বশেষ

pexels-mart-production-7480526

‘#MeToo’ এটা সম্পর্কে আমরা অনেকেই জানি। এটা কি শুধু কয়েকটি শব্দের সমষ্টি? না, বরং এটি এক ধরনের ডিজিটাল প্রতিবাদ, এক টুকরো কণ্ঠ যা স্ক্রিনের ভেতর থেকে বের হয়ে বাস্তব জগতে নাড়া দেয়। আজকের বিশ্বে হ্যাশট্যাগ আর নিছক ট্রেন্ড নয়, এটি হয়ে উঠেছে নাগরিক অংশগ্রহণের নতুন ভাষা। সোশ্যাল মিডিয়ার নীল-সাদা পর্দার আড়ালে যে কথাগুলো একসময় চাপা পড়ে থাকত, সেগুলো এখন # চিহ্নের মাধ্যমে একত্রিত হয়ে শক্তিতে রূপ নেয়।

ডিজিটাল যুগে মানুষ শুধু দর্শক নয় বরং সক্রিয় অংশগ্রহণকারী বা এক্টিভিস্ট। একটি পোস্ট, একটি ছবি কিংবা একটি ছোট ভিডিও এর সঙ্গে যুক্ত একটি হ্যাশট্যাগ মুহূর্তেই হাজারো মানুষের মনোযোগ কাড়তে পারে। যেন অনলাইন জগৎ একটি বিশাল মঞ্চ, আর হ্যাশট্যাগ হলো মাইক্রোফোন। যার হাতে এই মাইক্রোফোন তার কণ্ঠও পৌঁছে যায় বহুদূর।

অনলাইনে নাগরিক কণ্ঠের উদ্ভব

সাভারে শিশু শ্রমবিরোধী একটি উদ্যোগ থেকে শুরু হয় #StopChildLabour হ্যাশট্যাগের যাত্রা। কয়েকজন তরুণ ফেসবুকে কিছু ছবি ও ভিডিও পোস্ট কর। প্রথমে এটি ছিল সীমিত পরিসরের প্রতিবাদ। কিন্তু ধীরে ধীরে শেয়ার, রিঅ্যাকশন আর মন্তব্যের ঢেউ সেটিকে ভাইরাল করে তোলে। সংবাদমাধ্যম বিষয়টি তুলে ধরে এবং প্রশাসনও নড়েচড়ে বসে।

এখানেই ডিজিটাল ডেমোক্রেসির আসল শক্তি। আগে যেখানে স্থানীয় সমস্যাগুলো বড় পরিসরে আলোচিত হতো না এখন একটি হ্যাশট্যাগ সেই সমস্যাকে জাতীয় আলোচনায় নিয়ে আসে। এটি নাগরিকদের মধ্যে সংহতি তৈরি করে- একজন পোস্ট করলে অন্যজন সাহস পায়, আরেকজন যুক্ত হয়। যেন আগুনের ফুলকি থেকে দাবানল।

এ নিয়ে কলেজ পড়ুয়া মাহমুদা আক্তার বলে, “আমি এই হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে আমাদের এলাকার সমস্যাগুলো তুলে ধরেছি। অনলাইনে সচেতনতা তৈরি হয়েছে, কিছুটা হলেও সরকারি পদক্ষেপে পরিবর্তন এসেছে।”

এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, অনলাইন কণ্ঠ আর ভার্চুয়াল নয়,এটি বাস্তবের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

হ্যাশট্যাগের সামাজিক  রাজনৈতিক ভূমিকা

হ্যাশট্যাগ শুধু সচেতনতার মাধ্যম নয়, এটি রাজনৈতিক শক্তিরও অংশ। সামাজিক আন্দোলন থেকে শুরু করে কর্পোরেট প্রচারণা সব জায়গায় এর উপস্থিতি। কখনো এটি জনগণের দাবির প্রতীক, আবার কখনো প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কৌশলগত হাতিয়ার।

২০২৪ সালের সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহালের বিরুদ্ধে #QuotaMovement এর বড় উদাহরণ। কোটা সংস্কার আন্দোলনে এই হ্যাশট্যাগ ছিল প্রধান প্রতীক। হাজারো পোস্ট, লাইভ ভিডিও, প্রতিবাদী বক্তব্য সব এক জায়গায় এসে জমা হয় এই একটি চিহ্নের নিচে। ফলে আন্দোলনের বার্তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, তরুণদের মধ্যে তীব্র সাড়া তৈরি হয়।

আবার #ClimateStrikeBangladesh হ্যাশট্যাগ পরিবেশ সচেতনতা বাড়ানোর জন্য তৈরি হলেও, অ্যালগরিদমের খেলায় কিছু পোস্ট বেশি দৃশ্যমান হয়, কিছু হারিয়ে যায়।  প্রশ্ন ওঠে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কি সবার কণ্ঠ সমানভাবে শোনা যায়? হয়তো না।

আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহৃত ‘#MeToo’ সারা পৃথিবীতে দারুণভাবে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। এর  মাধ্যমে সারা বিশ্বের যৌন হয়রানির শিকার হওয়া নারীরা নিজেদের নিপীড়নের কথা ও বিচারে দাবি তুলেন যা অনন্য উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে  পারে।

হ্যাশট্যাগ তাই দ্বিমুখী তলোয়ার হিসেবেও ধরে অনেকে। এটি যেমন গণচেতনা তৈরি করতে পারে, তেমনি রাজনৈতিক বিভাজনও বাড়াতে পারে।

নারীর অংশগ্রহণ  ক্ষমতায়ন

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নারীদের জন্য এক নতুন জানালা খুলে দিয়েছে। আগে যেখানে সামাজিক বাধা নারীর কণ্ঠকে সীমাবদ্ধ করত, এখন একটি হ্যাশট্যাগ সেই কণ্ঠকে দৃশ্যমান করে তুলছে।

আন্তর্জাতিক নারী দিবসে কিংবা স্থানীয় সমস্যা নিয়ে অনেক নারী #SaveRiver বা #WomenForChange এর মতো হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে সচেতনতা তৈরি করছেন। মাহবুবা ইসলাম বলে,“আমরা #SaveRiver ব্যবহার করেছি। আমাদের গ্রামের নদী দূষণের সমস্যা অনলাইনে তুলে ধরেছি। এতে প্রশাসন বিষয়টি নিইয়ে অনেকটাই গুরুত্ব দিয়েছে।”

নারীরা এখন ডিজিটাল মাধ্যমে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, মতামত দিচ্ছেন, দাবি তুলছেন। হ্যাশট্যাগ যেন তাদের হাতে একটি শক্তিশালী কলম হিসেবে আবির্ভুত হয়েছে।

শিশু  কিশোরদের সচেতনতা

হ্যাশট্যাগ রাজনীতি এখন কেবল বড়দের বিষয় নয়। স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীরাও এটি ব্যবহার করছে নিজেদের সমস্যা ও স্বপ্ন প্রকাশে।

নরসিংদীর এক শিক্ষার্থী #EducationForAll ব্যবহার করে স্কুলের অবকাঠামোগত সমস্যার কথা তুলে ধরে। স্থানীয় প্রশাসন বিষয়টি দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। এটি ছোট উদাহরণ হলেও বড় বার্তা দেয়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ভবিষ্যৎ নাগরিকদের দায়িত্বশীল হতে শেখাচ্ছে। শিশু-কিশোররা যখন অনলাইনে নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে, তখন তারা শুধু সচেতনতা তৈরি করছে না; বরং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের চর্চাও করছে।

 

অনলাইন প্রচারণা বনাম বাস্তব পরিবর্তন

তবে সব হ্যাশট্যাগ সমান ফল দেয় না। অনেক সময় পোস্ট ভাইরাল হলেও বাস্তব পরিবর্তন ধীরগতিতে হয়। #FixOurRoads হ্যাশট্যাগ একটি গ্রামের ভাঙা রাস্তার চিত্র তুলে ধরেছিল। মানুষ সহমর্মিতা দেখালেও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে সময় লেগেছে।

এখানেই অনলাইন ও অফলাইনের ফারাক। হ্যাশট্যাগ চাপ