

জাপানে জন্ম নেওয়া সাত মাস বয়সী জাপানি মাকাক শাবক ‘পাঞ্চ’কে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। মায়ের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হওয়া এবং খাঁচার ভেতরে অন্য বানরদের আক্রমণাত্মক আচরণের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে সহানুভূতি তৈরি হয়েছে তাকে ঘিরে।
গত জুলাইয়ে জাপানের ইচিকাওয়া চিড়িয়াখানায় পাঞ্চের জন্ম হয়। জন্মের পরই মা তাকে ত্যাগ করলে কর্তৃপক্ষ তার হাতে একটি নরম খেলনা ওরাংওটাং তুলে দেয়। এরপর থেকেই খেলনাটিকেই আঁকড়ে ধরে থাকতে দেখা যায় তাকে। খাঁচার ভেতরে বয়সে বড় মাকাকদের টানা-হেঁচড়া ও তাড়া করার একাধিক ভিডিও প্রকাশ পায়।
ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, অন্য বানরদের ধাক্কা খেয়ে একা ঘুরে বেড়াচ্ছে পাঞ্চ, শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে তার খেলনাটি। এক পর্যায়ে আরেকটি বানরকে তাকে আদর করতে দেখা গেলে দর্শকদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে। তবে পরে নতুন ফুটেজে দেখা যায়, একটি বড় বানর তাকে আক্রমণাত্মকভাবে টানছে। শেষে পাঞ্চ একটি পাথরের আড়ালে লুকিয়ে খেলনাটি আঁকড়ে বসে থাকে।
অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রাইমেটোলজি বিশেষজ্ঞ অ্যালিসন বেহি বলেন, এমন ঘটনা বিরল হলেও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ঘটতে পারে। মায়ের বয়স, স্বাস্থ্য ও অনভিজ্ঞতা এর পেছনে কারণ হতে পারে।
তিনি জানান, পাঞ্চের মা প্রথমবার সন্তান জন্ম দিয়েছিলেন, যা অনভিজ্ঞতার ইঙ্গিত দেয়। পাশাপাশি তাপপ্রবাহের সময় জন্ম হওয়াও উচ্চ চাপের পরিবেশ তৈরি করেছিল। এমন পরিস্থিতিতে মা নিজের স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ প্রজননকে অগ্রাধিকার দিতে পারেন, বিশেষ করে যদি শাবকের স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে থাকে।
চিড়িয়াখানার তত্ত্বাবধায়ক কোসুকে শিকানো জানান, জন্মের পর জাপানি মাকাক শাবকরা মায়ের শরীর আঁকড়ে ধরে পেশিশক্তি ও নিরাপত্তাবোধ গড়ে তোলে। কিন্তু মা ত্যাগ করায় পাঞ্চের সে সুযোগ ছিল না। বিভিন্ন বিকল্প চেষ্টা যেমন তোয়ালে গুটিয়ে দেওয়া ব্যর্থ হওয়ার পর বানরসদৃশ একটি খেলনা দেওয়া হয়, যাতে ভবিষ্যতে দলে মিশে যেতে তার সহায়তা হয়।
অ্যালিসন বেহির মতে, খেলনাটি পাঞ্চের জন্য এক ধরনের ‘সংযুক্তির অবলম্বন’ হিসেবে কাজ করছে। এ বয়সে তার দুধপানের প্রয়োজনও থাকতে পারে।
তিনি আরও বলেন, অন্য বানরদের আচরণকে ‘বুলিং’ বলা যাবে না; এটি তাদের স্বাভাবিক সামাজিক কাঠামোর অংশ। জাপানি মাকাকদের সমাজব্যবস্থা মাতৃকেন্দ্রিক এবং কঠোর শ্রেণিবিন্যাসভিত্তিক। উচ্চপদস্থ পরিবার নিম্নপদস্থদের ওপর আধিপত্য দেখায়। তবে মায়ের অনুপস্থিতিতে পাঞ্চ আত্মসমর্পণের সামাজিক সংকেত শেখার সুযোগ কম পেতে পারে, যা ভবিষ্যতে দলে একীভূত হওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে।
পাঞ্চকে দেখতে সাম্প্রতিক সময়ে চিড়িয়াখানায় দর্শনার্থীর ভিড় বেড়েছে। কর্তৃপক্ষ খাঁচার চারপাশে নিরাপত্তা জোরদার করেছে এবং দর্শনার্থীদের নীরব থাকতে, সিঁড়ি বা ট্রাইপড ব্যবহার না করতে ও দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে না থাকতে অনুরোধ জানিয়েছে।
অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয়ের সংরক্ষণ মনোবিজ্ঞানী কার্লা লিচফিল্ড বলেন, জাপানি মাকাকদের বুদ্ধিমত্তার কারণে জাপানে বায়োমেডিক্যাল ও স্নায়ুবিজ্ঞান গবেষণায় তাদের ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি ফসলের ক্ষতির কারণে মাকাক নিধনের ঘটনাও ঘটে।
তিনি বলেন, পাঞ্চের গল্পটি আবাসস্থল ধ্বংস, জলবায়ু পরিবর্তন, চিড়িয়াখানার প্রাণী কল্যাণ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা যেন অবৈধ পোষা প্রাণী ব্যবসাকে উৎসাহিত না করে। কারণ বাচ্চা বানর দেখতে আকর্ষণীয় হলেও দ্রুত বড় হয়ে যায় পাঞ্চ চার বছরের মধ্যেই পূর্ণবয়স্ক হবে। বানরদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশের জন্য নিজেদের প্রজাতির সঙ্গেই থাকা প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, পাঞ্চই প্রথম নয়: ২০২৪ সালে থাইল্যান্ডের একটি পিগমি জলহস্তী ‘মু ডেং’ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।
তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান