

একটা ছবি কখনও কখনও শুধু ছবি থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে স্মৃতি, আত্মবিশ্বাস, নিজের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ। নিতুর কাছেও ছবিগুলো ছিল তেমনই নিজের মতো থাকার, নিজের পছন্দকে উদযাপন করার এক সহজ উপায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সে নিয়মিত ছবি শেয়ার করত। সাজগোজ, নতুন লুক, ছোটখাটো সাফল্য সব মিলিয়ে তার প্রোফাইল ছিল প্রাণবন্ত। নিজের আগ্রহ থেকেই খুলেছিল একটি বিউটি পেজ, যেখানে ছবি ছিল কাজের অংশ।
কিন্তু একদিন সেই স্বাভাবিকতাই বদলে গেল। তার কিছু ছবি ব্যবহার করে খোলা হলো ভুয়া আইডি। শুধু তাই নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে ছবিগুলো বিকৃত করে ছড়িয়ে দেওয়া হলো বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। পরিচিত–অপরিচিত মানুষের ইনবক্সে, কমেন্টে, এমনকি অন্য গ্রুপেও ঘুরতে লাগল সেই বিকৃত চেহারা। নিতুর জন্য এটি ছিল এক অদৃশ্য হামলা যেখানে আক্রমণকারী নেই সামনে, কিন্তু আঘাতটা গভীর।
অনলাইন অপমানের সঙ্গে আসে অদ্ভুত এক অসহায়ত্ব। আপনি জানেন কিছু ভুল হচ্ছে, কিন্তু কাকে ধরবেন? কোথায় যাবেন? নিতুও প্রথমে বুঝে উঠতে পারেনি কী করবে। পরিস্থিতি যখন অসহনীয় হয়ে ওঠে, তখন সে পরিবারের কাছে বিষয়টি জানায়। কিন্তু প্রত্যাশিত সমর্থনের বদলে সে শুনতে পায় “ফেসবুকে ছবি দিতে হবে কেন?” প্রশ্নটা যেন তাকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়। অপরাধ করেছে কেউ অন্যজন, অথচ জবাবদিহি করতে হচ্ছে তাকেই।
এই ভিকটিম ব্লেমিংয়ের সংস্কৃতি আমাদের সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত। অনলাইনে ছবি শেয়ার করলেই কি কেউ হেনস্তার অনুমতি দিয়ে দেয়? নিশ্চয়ই না। কিন্তু বাস্তবে প্রায়ই দেখা যায়, অপরাধীর চেয়ে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ হয় ভুক্তভোগীর আচরণ। ফলে অনেক নারী ধীরে ধীরে নিজেদের গুটিয়ে নেন। কেউ প্রোফাইল লক করেন, কেউ ছবি মুছে ফেলেন, কেউ একসময় পুরোপুরি অনলাইন ছেড়ে দেন। এর মানে শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, ডিজিটাল পরিসরে নারীর উপস্থিতি কমে যাওয়া।
তবে নিতু নীরব থাকার পথ বেছে নেয়নি। সে থানায় গিয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে। প্রমাণ হিসেবে সংরক্ষণ করে স্ক্রিনশট, লিংক, ভুয়া আইডির তথ্য। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রিপোর্ট করে বিকৃত কনটেন্ট। এটি ছিল তার আত্মরক্ষার পাশাপাশি প্রতিবাদের পথ। সে বুঝেছিল, চুপ থাকলে সমস্যা থামবে না।
সংশ্লিষ্ট থানার এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ব্যবহার করে হেনস্তার ঘটনা এখন গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং সাইবার নিরাপত্তা আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। এই অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি পরিষ্কার করে যে ডিজিটাল হেনস্তা কোনো “ছোটখাটো ব্যাপার” নয়, বরং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
নিতুর গল্প আমাদের সামনে বড় একটি বাস্তবতা তুলে ধরে। প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, অপব্যবহারের পথও তত বিস্তৃত হচ্ছে। কিন্তু প্রযুক্তি একা দায়ী নয়; দায় আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিরও। একটি মেয়ের ছবি দেখলেই তাকে টার্গেট বানানোর মানসিকতা বদলানো জরুরি। পরিবারকে শিখতে হবে সমর্থন দিতে, সমাজকে শিখতে হবে দোষারোপ নয়, সহমর্মিতা দেখাতে।
ডিজিটাল ডেমোক্রেসি তখনই অর্থবহ হবে, যখন অনলাইন পরিসর সবার জন্য নিরাপদ হবে। যখন কেউ নিজের ছবি শেয়ার করার আগে ভয় পাবে না। যখন কোনো হেনস্তার ঘটনায় প্রথম প্রশ্ন হবে না “তুমি কেন ছবি দিলে?” বরং হবে “অপরাধী কে?”
নিতুর লড়াই হয়তো ব্যক্তিগত, কিন্তু এর প্রতিধ্বনি সামাজিক। তার মতো আরও অনেকেই একই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যায়, অনেকেই চুপ থাকে। সেই নীরবতা ভাঙার মধ্যেই শুরু হয় পরিবর্তন। নিরাপদ ডিজিটাল ভবিষ্যৎ গড়তে হলে ভয় নয়, অধিকার এই জায়গা থেকেই আমাদের দাঁড়াতে হবে।