

রাত তখন সাড়ে এগারোটা। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের ছোট্ট রুমে বসে ফেসবুকে একটি পোস্ট লিখেছিল আরিবা (ছদ্মনাম)। বিষয়টি ছিল নারীর নিরাপত্তা নিয়ে, একটি সাম্প্রতিক ঘটনাকে ঘিরে তার ব্যক্তিগত মতামত। পোস্ট দেওয়ার পর প্রথম কয়েক মিনিটে সবকিছুই স্বাভাবিক ছিল। তারপর ধীরে ধীরে নোটিফিকেশনের সংখ্যা বাড়তে থাকে। কিন্তু সমর্থন নয়, বরং একের পর এক আক্রমণাত্মক মন্তব্য, কুরুচিপূর্ণ ভাষা, ব্যক্তিগত অপমান আর হুমকি।
তুমি এসব বুঝো কী?
এমন মেয়েদের কারণেই সমাজ নষ্ট।
চুপ না থাকলে দেখে নেব।
শুরুতে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছিল আরিবা। পরে আর পারেনি। মোবাইলটা সাইলেন্ট করে রেখে দেয়। কিন্তু শব্দ বন্ধ হলেও শব্দের আঘাত থামেনি। কয়েকদিন ঘুম হয়নি ঠিকমতো। ক্লাসে মন বসেনি। শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকেই বিরতি নেয় সে।
এই গল্প একা আরিবার নয়। ডিজিটাল যুগে মত প্রকাশের স্বাধীনতা যত সহজ হয়েছে, ততই বেড়েছে বিদ্বেষমূলক মন্তব্য বা অনলাইন ঘৃণার প্রবণতা। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের জন্য এটি এক নীরব মানসিক সংকটে পরিণত হচ্ছে।
ভার্চুয়াল আঘাত, বাস্তব যন্ত্রণা
অনলাইন হেট স্পিচ বা বিদ্বেষমূলক বক্তব্যকে অনেকেই “স্ক্রিনের ভেতরের ব্যাপার” বলে হালকাভাবে দেখেন। কিন্তু মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, ডিজিটাল আক্রমণও বাস্তব মানসিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। যখন একজন তরুণ তার পরিচয়, বিশ্বাস বা মতামতের কারণে ধারাবাহিকভাবে অপমানিত হন, তখন তা আত্মসম্মানে সরাসরি আঘাত হানে।
ঢাকার এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাফি জানান, রাজনৈতিক একটি ইস্যুতে মতামত দেওয়ার পর তাকে “দেশদ্রোহী” আখ্যা দিয়ে শতাধিক মন্তব্য করা হয়। কেউ কেউ তার ব্যক্তিগত ছবিও শেয়ার করে বিদ্রূপ করে। “আমি কয়েকদিন বাইরে বের হতেও ভয় পেয়েছিলাম,” বলছিলেন তিনি। “মনে হচ্ছিল সবাই আমাকে চেনে, সবাই ঘৃণা করছে।”
গবেষণায় দেখা গেছে, অনলাইন ঘৃণার শিকার তরুণদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, সামাজিক ভীতি এবং আত্মসম্মানহানি বাড়ে। অনেকেই নিজেদের মত প্রকাশে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। কেউ কেউ ধীরে ধীরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সরে যান। আবার কেউ বাস্তব সম্পর্ক থেকেও দূরে সরে পড়েন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমও এই সমস্যাকে তীব্র করছে। উত্তেজনামূলক বা আক্রমণাত্মক কনটেন্ট সাধারণত বেশি প্রতিক্রিয়া পায় লাইক, কমেন্ট, শেয়ার। ফলে সেগুলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এতে তৈরি হয় এক ধরনের “ইকো চেম্বার”, যেখানে ব্যবহারকারীরা একই ধরনের মতামতের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়েন।
এই পরিবেশে ভিন্নমতকে সহজেই শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ধীরে ধীরে বিদ্বেষমূলক ভাষা স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। যা একসময় অগ্রহণযোগ্য ছিল, তা–ই হয়ে দাঁড়ায় দৈনন্দিন অনলাইন আচরণ।সমাজবিজ্ঞানী ডা. সালমা আক্তার বলেন, “ডিজিটাল পরিসরে বারবার ঘৃণার ভাষা দেখলে তা আমাদের অনুভূতিকে ভোঁতা করে দেয়। আমরা ভাবতে শুরু করি এটাই স্বাভাবিক।”
‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’ নাকি দায়িত্বহীনতা?
অনেকে যুক্তি দেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি। কিন্তু প্রশ্ন হলো স্বাধীনতা কি সীমাহীন? যখন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে তাদের ধর্ম, লিঙ্গ, জাতিগত পরিচয় বা রাজনৈতিক মতের কারণে ধারাবাহিকভাবে অপমান করা হয়, তখন তা কেবল মতপ্রকাশ থাকে না; তা হয়ে ওঠে আঘাত।
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, অনলাইন ঘৃণা কেবল ভার্চুয়াল পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন ঘটনায় দেখা গেছে, সামাজিক মাধ্যমে উসকানিমূলক পোস্ট ভাইরাল হওয়ার পর বাস্তব জীবনে সহিংসতা ছড়িয়েছে। অর্থাৎ, স্ক্রিনের ভেতরের ভাষা একসময় রাস্তায় নেমে আসে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই আক্রমণের ফলে অনেক তরুণ নীরব হয়ে যাচ্ছেন। তারা আর মত প্রকাশ করতে চান না। বিতর্ক এড়িয়ে চলেন। এমনকি সামাজিক ইস্যু নিয়েও কথা বলতে ভয় পান।মনোবিজ্ঞানী ডা. মেহজাবিন রহমানের মতে, “ধারাবাহিক অনলাইন আক্রমণ একজন তরুণকে নিজের মূল্যবোধ ও পরিচয় নিয়ে সন্দিহান করে তোলে। দীর্ঘমেয়াদে এটি আত্মবিশ্বাস ও মানসিক স্থিতিশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।”
এই নীরবতা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; এটি সামাজিক ক্ষতিও। কারণ তরুণরাই সমাজের সবচেয়ে প্রাণবন্ত কণ্ঠস্বর। যদি তারা ভয় পেয়ে চুপ করে যায়, তাহলে গণতান্ত্রিক আলাপ–আলোচনার ক্ষেত্র সংকুচিত হয়।
কী করা জরুরি?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমাধান একমুখী নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, অনলাইনে আমরা যে ভাষা ব্যবহার করি, সেটিও যে বাস্তব মানুষের মনে আঘাত হানতে পারে এই সচেতনতা গড়ে তোলা।
ডিজিটাল পরিসর এখন আর আলাদা কোনো জগৎ নয়; এটি আমাদের বাস্তব জীবনেরই সম্প্রসারণ। সেখানে ছড়িয়ে পড়া ঘৃণা শেষ পর্যন্ত মানুষের মন, সম্পর্ক ও সামাজিক সম্প্রীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।মত প্রকাশের স্বাধীনতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন দায়িত্ববোধ। কারণ একটি মন্তব্য কেবল শব্দ নয় কখনও কখনও তা হয়ে উঠতে পারে কারও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক আঘাতের সূচনা।