

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে প্রতি শুক্রবার বিকেলে এক টুকরো রঙের মেলা বসে। ভিড় ঠেলে সামনে এগোলে দেখা যায় রঙিন সুতো, পাথর আর পুঁথির কারুকাজে সাজানো একগুচ্ছ হাতে তৈরি চুড়ি। সেই স্টলের পেছনে উজ্জ্বল চোখে তাকিয়ে থাকা তরুণীটির নাম আনিকা তাসকিন। তিনি এই ক্যাম্পাসেরই শিক্ষার্থী, কিন্তু তার নতুন পরিচয় একজন উদ্যোক্তা হিসেবে।
আনিকার এই গল্পটি কেবল চুড়ি বিক্রির নয়; এটি একটি স্মার্টফোন, ইন্টারনেট আর প্রবল ইচ্ছাশক্তির সাহায্যে নিজের ভাগ্য নিজে গড়ার গল্প। যাকে সমাজবিজ্ঞানীরা এখন বলছেন ‘ডিজিটাল গণতন্ত্রের সুফল’।
শখের বসে শুরু, স্বপ্নের দিকে যাত্রা
আনিকার উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার শুরুটা ছিল একেবারেই ঘরোয়া। পড়াশোনার চাপে যখন হাফিয়ে উঠতেন, তখন অবসরে ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে চোখে পড়ত হাতে তৈরি গয়নার নানা ডিজাইন। সেই কৌতূহল থেকেই একদিন নিজের জন্য কিছু একটা বানানোর চেষ্টা।
“প্রথম যখন নিজের জন্য চুড়ি বানিয়ে হাতে পরলাম, বন্ধুরা খুব প্রশংসা করল। তখনই মনে হলো, আমি কি পারব না এটাকে সবার কাছে পৌঁছে দিতে?” এভাবেই স্মৃতিচারণ করছিলেন আনিকা। সেই ভাবনা থেকেই জন্ম নিল তার অনলাইন উদ্যোগ ‘Blossom Cherry’।
যখন স্মার্টফোনই হলো শোরুম
আগেকার দিনে ব্যবসা মানেই ছিল বড় পুঁজি, দোকানের অগ্রিম টাকা আর পরিচিতি পাওয়ার জন্য মাইকিং। কিন্তু আনিকার কাছে এসবের কিছুই ছিল না। তার ছিল একটি সাধারণ স্মার্টফোন আর সৃজনশীলতা। নিজের হাতে তৈরি পণ্যের ছবি তোলা, ফেসবুক পেইজে আপলোড করা আর লাইভ ভিডিওর মাধ্যমে গ্রাহকদের সাথে সরাসরি কথা বলা, এভাবেই শুরু হলো তার ভার্চুয়াল শোরুমের যাত্রা।
আনিকা বলেন, “অফলাইন স্টলটা কেবল মানুষের সাথে একটু দেখা করার জন্য। কিন্তু আমার ব্যবসার আসল প্রাণ হলো ফেসবুক। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম না থাকলে হয়তো আমার এই কাজ ক্যাম্পাসের চার দেয়ালের বাইরে বের হতেই পারত না।”
ডিজিটাল গণতন্ত্র: সবার জন্য সমান মাঠ
আনিকার এই জয়যাত্রায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে ‘ডিজিটাল ডেমোক্রেসি’ বা ডিজিটাল গণতন্ত্র। এই ব্যবস্থায় প্রযুক্তির কল্যাণে সুযোগ এখন সবার জন্য সমান। এখানে ধনী-দরিদ্র বা বড় শহর-ছোট শহরের কোনো ভেদাভেদ নেই। যার সৃজনশীলতা আছে, তার কণ্ঠই পৌঁছে যাচ্ছে হাজারো মানুষের কাছে। কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা দালাল ছাড়াই আনিকা সরাসরি তার গ্রাহকদের রিভিউ পাচ্ছেন, তাদের চাহিদা বুঝছেন।
এই ডিজিটাল স্বাধীনতা তরুণদের হাতে তুলে দিয়েছে নিজেদের পরিচয় তৈরি করার এক অনন্য ক্ষমতা। আনিকা এখন কেবল পড়াশোনা শেষে চাকরির প্রত্যাশী নন, বরং তিনি নিজেই একজন কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী হওয়ার স্বপ্ন দেখেন।
ডিজিটাল গণতন্ত্রের এই যুগে তরুণরা আর শুধু চাকরির দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার অপেক্ষায় নেই। তারা নিজের দক্ষতাকে ডিজিটাল সরঞ্জামের সাথে যুক্ত করে গড়ে তুলছে আগামীর অর্থনীতি। একটি ছোট্ট স্মার্টফোন, ইন্টারনেট সংযোগ আর বড় এক বুক স্বপ্ন, এই তিনের সমন্বয়েই লেখা হচ্ছে ডিজিটাল বাংলাদেশের নতুন সব সাফল্যের মহাকাব্য।