

টাঙ্গাইলের ছেলে রাফাত। ২০২৩–২৪ শিক্ষাবর্ষে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে পড়ছেন। স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা শেষ করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবেন। কিন্তু এক সামান্য মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেনই তার জন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
গত ১৯ ফেব্রুয়ারি, ক্যাম্পাসের সামনের একটি দোকান থেকে তিনি বিকাশে ক্যাশইন করেন। সাধারণ একটি আর্থিক লেনদেন যা প্রতিদিন হাজারো শিক্ষার্থী করে থাকে। কিন্তু পরদিন সকালেই শুরু হয় অপ্রত্যাশিত বিপত্তি। অজানা একটি নম্বর থেকে ফোন আসে। ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তি জানায়, যে দোকান থেকে ক্যাশইন করা হয়েছে, সেই দোকানের একটি অবৈধ লেনদেনের ঘটনায় তার নাম জড়িয়ে গেছে এবং তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্কিত রাফাত জানতে চান সমাধানের উপায়। তখন বলা হয়, পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে।
কিছুক্ষণ পর আরেকটি নম্বর থেকে ফোন আসে। পরিচয় দেওয়া হয় পুলিশ হেডকোয়ার্টারের কর্মকর্তা হিসেবে। জানানো হয়, ১৭,৩০০ টাকা একটি নির্দিষ্ট নম্বরে পাঠালে লেনদেনটি ‘ফেইল’ হবে, টাকা ফেরত আসবে এবং মামলাও তুলে নেওয়া হবে। ভয়, অজ্ঞতা এবং পরিস্থিতির চাপে রাফাত ১৭ হাজার টাকা পাঠান। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই দেখেন, যে অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো হয়েছিল সেটি বন্ধ। ফোন নম্বরও অচল।
রাফাত একা নন। বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও বহু শিক্ষার্থী এমনকি শিক্ষকও এ ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন। জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট এজেন্ট দোকানে যারা লেনদেন করেছেন, তাদের অনেকেই একই ধরনের কল পেয়েছেন। অর্থাৎ এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং একটি সংঘবদ্ধ চক্রের পরিকল্পিত প্রতারণা।
এই ঘটনাটি কেবল আর্থিক জালিয়াতি নয় এটি ডিজিটাল গণতন্ত্রের মূল ভিত্তির ওপর আঘাত। ডিজিটাল সেবার অন্যতম শর্ত হলো নাগরিকের তথ্যের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা। কিন্তু যখন কোনো এজেন্ট ব্যক্তিগত লেনদেনের তথ্য অপরাধীদের কাছে ফাঁস করে দেয়, তখন তা ‘ডেটা সোভরেনিটি’ বা তথ্য–স্বাধীনতার চরম লঙ্ঘন। একজন শিক্ষার্থীর ফোন নম্বর, লেনদেনের সময়, অর্থের পরিমাণ এসব তথ্য যদি অপরাধীদের হাতে চলে যায়, তাহলে তা শুধুমাত্র অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, মানসিক নিরাপত্তারও বড় হুমকি।
আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, প্রতারকেরা আইন–শৃঙ্খলা বাহিনীর নাম ব্যবহার করে ভয় সৃষ্টি করছে। পুলিশ পরিচয়ে ফোন দিয়ে মামলা ও গ্রেপ্তারের ভয় দেখানো মানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল করে দেওয়া। যখন একজন শিক্ষার্থী বুঝতে পারে যে তার ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত নয় এবং যেকোনো সময় তাকে মিথ্যা মামলার ভয় দেখানো হতে পারে, তখন সে ডিজিটাল সেবা ব্যবহারে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ কিংবা ডিজিটাল গণতন্ত্রের স্বপ্ন তখনই সফল হবে, যখন প্রযুক্তি মানুষের জীবন সহজ করবে, ভীতিকর নয়। কিন্তু এ ধরনের ঘটনার ফলে শিক্ষার্থীরা মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করতে ভয় পাচ্ছে। কেউ কেউ ক্যাশইন বা ক্যাশআউটের আগে দশবার ভাবছে। এই অনিরাপত্তা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল সমাজ গঠনের পথে বড় বাধা।
সমাধান কী? প্রথমত, মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টদের ওপর কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। লেনদেনকারীদের তথ্য ফাঁস হলে তার দায় এজেন্টকেই নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, সাইবার অপরাধ দমন ইউনিটকে সক্রিয়ভাবে এসব চক্র শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি কোনো অবস্থাতেই আইন–শৃঙ্খলা বাহিনী ফোন করে অর্থ দাবি করে না, এই বার্তাটি স্পষ্টভাবে প্রচার করতে হবে।
রাফাতের হারানো ১৭ হাজার টাকা হয়তো আর ফিরে আসবে না। কিন্তু তার অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। ডিজিটাল সেবার সুবিধা গ্রহণ করতে হলে নিরাপত্তা ও আস্থার ভিত্তি মজবুত করতে হবে। নইলে ডিজিটাল গণতন্ত্র কেবল কাগুজে ধারণা হয়ে থাকবে বাস্তবে তা শিক্ষার্থীদের জন্য এক অনিরাপদ ফাঁদেই পরিণত হবে।