

একসময় সরকারি দপ্তরে কোনো তথ্যের জন্য সাধারণ মানুষকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবতে হতো— “কোথায় গেলে কাজ হবে? কতদিন ঘুরতে হবে?” ফাইলের স্তূপ আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতার ভেতর দিয়ে পথ খোঁজা ছিল এক দুঃসাধ্য লড়াই। কিন্তু আজ সেই দৃশ্যপট আমূল বদলে দিয়েছে হাতের মুঠোয় থাকা একটি স্মার্টফোন এবং ইন্টারনেট সংযোগ। প্রযুক্তি আর সচেতনতার এই মিশেলে তৈরি হচ্ছে ‘ডিজিটাল ডেমোক্রেসি’ বা ডিজিটাল গণতন্ত্র।
তথ্য অধিকার: আইন যখন হাতের মুঠোয়
ডিজিটাল গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো নাগরিকের কণ্ঠকে দৃশ্যমান ও প্রভাবশালী করে তোলা। ২০০৯ সালের তথ্য অধিকার আইন এই প্রক্রিয়াকে আইনি ভিত্তি দিয়েছে। তবে স্মার্টফোন সেই আইনের প্রয়োগকে সাধারণের নাগালে পৌঁছে দিয়েছে।
লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ইতি আক্তার বলছিলেন, “তথ্য অধিকার আইনের কথা আগে কেবল কানেই শুনেছিলাম। এখন মোবাইলে সার্চ করে আইনটি পড়েছি। এমনকি কোন ফর্মে আবেদন করতে হয়, তাও ডাউনলোড করে নিয়েছি। এখন অন্তত জানি যে প্রশ্ন করা আমার অধিকার।” এই সহজীকরণই ডিজিটাল গণতন্ত্রের প্রাণ।
প্রশাসন ও নাগরিকের বদলে যাওয়া রসায়ন
স্মার্টফোনের মাধ্যমে একজন নাগরিক এখন জানতে পারেন তার এলাকায় রাস্তার কাজে কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে কিংবা কাজের মান কেমন হওয়া উচিত। এই জবাবদিহিতা প্রশাসনকেও সজাগ রাখছে।
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাথৈয়াপ্রু মারমা এ প্রসঙ্গে বলেন, “মানুষ এখন অনেক সচেতন। তারা আইন ও বিধি জেনে সরাসরি তথ্য চায়। এতে প্রশাসনের কাজেও স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা বাড়ছে।” যখন প্রশাসন জানে যে নাগরিক সচেতন এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে যেকোনো তথ্য যাচাই করতে সক্ষম, তখন ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা সহজ হয়।
মুদ্রার উল্টো পিঠ: বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ
তবে প্রযুক্তির এই অগ্রযাত্রার পথ পুরোপুরি নিষ্কণ্টক নয়। ডিজিটাল গণতন্ত্রের সুফল সবাই সমানভাবে পাচ্ছেন না। এখানে প্রধান তিনটি চ্যালেঞ্জ দৃশ্যমান:
সচেতনতাই সমাধানের পথ
ডিজিটাল গণতন্ত্র তখনই কার্যকর হবে যখন স্মার্টফোনের সঙ্গে ‘ডিজিটাল সাক্ষরতা’ যুক্ত হবে। শুধু স্মার্টফোন থাকাই যথেষ্ট নয়; জানতে হবে কীভাবে সঠিকভাবে আবেদন করতে হয় এবং প্রাপ্ত তথ্য কীভাবে দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতে হয়।
আজকের বাংলাদেশে স্মার্টফোন শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি নাগরিক অধিকার চর্চার একটি প্ল্যাটফর্ম। তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ নাগরিককে যে আইনি শক্তি দিয়েছে, স্মার্টফোন সেই শক্তিকে বাস্তবে রূপ দিচ্ছে। প্রযুক্তি ও আইনের এই সমন্বয় প্রশ্ন করাকে কেবল সাহসের নয়, বরং একটি সহজ অভ্যাসে পরিণত করেছে। এই মানসিক পরিবর্তনই একটি স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের প্রকৃত ভিত্তি।